নাগরিক অধিকার আদায় করতে না পারাই মুন্সীগঞ্জের সংখ্যালঘুদের দেশ ত্যাগের প্রধান কারণ

 Posted on


সুব্রত দাস রনক, মুন্সীগঞ্জ :: এদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতন-নিপীড়ন চালানোর ঘটনা আজ আর নতুন কোনো কিছু নয়। ১৯৪৭ সাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশে হিন্দু সহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর লোকেরা নির্যাতিত হন। মাঝেমাঝেই সে সব ঘটনা সংবাদমাধ্যমে আসে, আবার কখনও তা থেকে যায় অন্ধকারে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ নীতি থাকা স্বত্তেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিতে বাংলাদেশ সরকার ব্যর্থ হয়েছে। সরকারকে অবগত করার পরও উচ্ছেদ সামাজিক,ধর্মীয়,অর্থনৈতিক,নারী নির্যাতন,হয়রানী ও জমি দখলে থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছেনা দেশটির সংঘলঘু সম্প্রদায়গুলো। মূলত এদেশে সংখ্যালঘুদের দেশ ত্যাগের প্রধান কারণ নাগরিক অধিকার ক্ষুন্ন । হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকজনের বাড়ি দখল, মেয়ে নিয়ে পালানো এমনকি আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে মুন্সীগঞ্জ সিরাজদিখান ও লৌহজং উপজেলার খিদিরপাড়া গ্রামে। বরং এদেশের সংখ্যালঘুরা সুদীর্ঘকাল ধরেই প্রতিনিয়ত হামলা-নির্যাতন-নিপীড়ন ও বিচ্ছিন্নতাবোধের শিকার হয়ে আসছেন। অপেক্ষাকৃত সংখ্যাগত স্বল্পতা, জাতিগত স্বাতন্ত্রতা এবং ভিন্ন ধরনের জীবন-রীতির কারণে এদেরকে প্রতিনিয়তই নানাবিধ সমস্যা ও বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাংলা পাঠ্যপুস্তক থেকে দেশটির ঐতিহ্যগত ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়গুলোতে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। যেমন অমুসলিম লেখকদের লেখা সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং ধর্মের সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন সব বিষয়েও ধর্মীয় উপাদান যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত খবর অনুসারে নির্বাচন নিয়ে আতঙ্কেই রয়েছেন হিন্দুরা। কারণ এমন অনেকেই নির্বাচনে অংশ নেবেন যাদের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলি তাদের নির্বাচনে যেন মনোনয়ন না দেয়, তার দাবি তুলেছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সংগঠনগুলি। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ- খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের তথ্যমতে, সরকার ভূমি বিরোধ সংক্রান্ত মামলাগুলোর ভিতর এ পর্যন্ত তিন শতাংশ বিচার করেছে। যেসব হিন্দুরা সম্পত্তি রেখে ভারত চলে গেছে সেগুলোর বিরোধ নিষ্পত্তিতে জেলা প্রশাসক এবং আইন মন্ত্রণালয়ে ধীর গতিতে কাজ করছে। দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হরতাল ও অবরোধের নামে দেশব্যাপী নারকীয় তান্ডব চালানোর পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। গত ২৮ নভেম্বর এনজিও শারি’র মুন্সীগঞ্জ সিরাজদিখান কার্যালয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সংলাপে দলিত হিন্দু নারীরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, দেশে যেভাবে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চলছে, যেভাবে দেশছাড়া হচ্ছে, তাতে এই দেশ একদিন আদিবাসী ও দলিত সংখ্যালঘুশূণ্য হয়ে যাবে। ওই সভার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১৯৪৭ সালে দেশে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা ছিল ৩০ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে তা মাত্র ৯ শতাংশে নেমে আসে। এই পরিসংখ্যান থেকে এটা স্পষ্ট যে, দেশে দিনে দিনে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। নতুনভাবে দলিত ও সংখ্যালঘু বাস্পায়িত হওয়ার কারণ সম্পর্কে সিরাজদিখান রাজদিয়া গ্রামের তরুণ রাজবংশীর মেয়ে প্রার্থনা রাজবংশী বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী কর্তৃক হামলা-নির্যাতন-নিপীড়ন চালানোসহ তাদের মন্দিরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা তাদের কাছে ‘মড়ার ওপরে খাঁড়ার ঘা’ ছাড়া আর কিছুই নয়। মরিচা জেলে পাড়ার সুবল রাজবংশীর মেয়ে শিপ্রা রাজবংশী বলেন, এদেশে মুসলমান বয়সে ছোট ছোট ছেলেদের হিন্দু মেয়েদের সম্পর্কে বিরুপ আচরণ (মানসিক নির্যাতন) এসব কারণে এখন স্বাভাবিকভাবেই এদেশের সংখ্যালঘুদের পক্ষে তাদের নিজস্ব ধর্ম, সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব রক্ষা করা সত্যিকার অর্থেই এক কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিরাজদিখান রাজানগর মধুপুর গ্রামের মৃত ননী গোপালের ছেলে নন্দরাজ দাস বলেন, হিন্দু সম্পত্তি ও হিন্দুদের মন্দিরের সম্পক্তির উপর এদেশের সংখ্যালঘু মসলমানদের বিশেষ নজর রয়েছে। সিরাজদিখানের মধুপুরে হিন্দুরা সংখ্যায় কম বিধায় মধুপুর মন্দিরের জায়গায় মাটি ও সীমানা প্রাচীর তৈরীতে বাধা দেন এখানকার মুসলিমরা কিন্তু এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, ইছাপুরা কুসুমপুরের শ্রাবন্তী রানী দাস ও কেয়াইন কুচিয়ামোড়ার ইতি রানী দাস বলেন, এদেশের সংখ্যালঘুদের আজ জীবন ধারণ ও জাতিগত অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতিটি মুহূর্তেই তাদেরকে এক কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে-যা তাদের কাছে নিজভূমে পরবাসীর সমতুল্য। আর এখানেই বুঝি এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুঃখ-কষ্টটা সবচেয়ে বেশি, সবচেয়ে বেদনার। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সুতরাং এদেশের নাগরিক হিসেবে তাদের শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করা, নির্বিগ্নে ধর্মীয় রীতিনীতি ও সংস্কৃতি পালন করা, নিশ্চিতভাবে জীবন-যাপন করা, চলাচল করার অধিকার, বাক-স্বাধীনতা, শিক্ষা-চিকিৎসাসহ বিভিন্ন অধিকার পাওয়াটা তাদের সাংবিধানিক অধিকার। আবার অন্যদিকে তা মানবাধিকারও বটে। আর তাদেরকে যদি এসব অধিকার না দেয়া হয় বা অধিকার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়, তবে তা হবে সাংবিধানিক অধিকার লংঘনসহ মানবাধিকার লংঘন করার শামিল। এ কথা অনস্বীকার্য যে, এদেশের মোট জনগোষ্ঠীর এক উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। এদেশের জনগণ হিসেবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই কর্তব্য। সংখ্যালঘুদের ওপর এভাবে হামলা-নির্যাতন ও নিপীড়ন চালালে এবং তাদের বিভিন্ন অধিকার নিশ্চিত করা না হলে তথা দিনে দিনে তারা যদি এভাবে বঞ্চিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত হতেই থাকেন তবে এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রতিবাদের দাবানল জ্বলে ওঠতে পারে-যা হবে সকলের কাছেই অপ্রত্যাশিত। স্মরণ রাখা দরকার, এ দেশটি আমার, আপনার, সকলের। পাশাপাশি এ কথাও স্মরণ রাখা প্রয়োজন, দেশের উল্লেখযোগ্য এক জনগোষ্ঠীকে সমাজের একবারে প্রান্তিক অবস্থানে রেখে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। কারণ, দেশের সকল জনগণের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমেই কেবলমাত্র একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব, অন্যথায় নয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ দেশের সাধারণ জনগণের ওপর হামলা-নির্যাতন-নিপীড়ন চালানোসহ রক্তের হলি খেলা ও তান্ডবলীলা চালিয়ে যাচ্ছে, যারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য প্রতিনিয়তই হুমকিস্বরূপ কাজ করে যাচ্ছে; দেশের সকলের বৃহত্তর স্বার্থেই তাদের বিরুদ্ধে দ্রæত শান্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা কি এখন অপরিহার্য বিষয় নয় ?

সুব্রত দাস রনক, দৈনিক যুৃগান্তরের সিরাজদিখান প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ দলিত এন্ড মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments