নওগাঁর সাংস্কৃতিক বিকাশে নিভৃতে অবদান রেখে চলেছে দলিত ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী

 Posted on

মো. আতাউর রহমান, নওগাঁ :: বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল দেশ। আজকের স্বাধীন সার্বভৌমত্ব বাংলাদেশের পিছনে রয়েছে সুদীর্ঘ বঞ্চনা ও সংগ্রামের ইতিহাস। বঞ্চনা, শোষণ ও নিপীড়নের নাগপাশ কেটে ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে আজকের সুখী ও সমৃদ্ধশীল বাংলাদেশের। ১৭৫৭ সালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব সিরাজুদৌল্লার পতন, ইংরেজদের ক্ষমতা দখল, দীর্ঘ ১৯০ বছর ইংরেজ শাসন, ভারত-পাকিস্তান বিভক্তি, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের মতো কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করে আজকের এই বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে। শাসনভার পরিবর্তনের প্রতিটি স্তরের সাথে মিশে আছে বাংলার আপামর জনসাধারণের সংগ্রামী চেতনা ও রক্তের দাগ। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে বাংলার সকল শ্রেণী পেশার মানুষ হাতে হাত রেখে দেশমাতৃকার সম্মান, ভাষা, সংস্কৃতি রক্ষার জন্য শাসক গোষ্ঠীর বুলেটের সামনে নিজেদের বুকের তাজা রক্ত বিসর্জন দিয়েছিল। সঙ্গত কারণেই আজকের বাংলাদেশের যে অগ্রযাত্রা তার পিছনে দলিত, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর যে অবদান তা কোন ভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

এবার আসা যাক বাংলার সংস্কৃতি বিকাশের কথায়। ঐতিহ্যগত ভাবে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজা-বাদশা ও কোম্পানীর শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রত্যেক শাসক গোষ্ঠীই তাদের নিজ নিজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাদের প্রজাদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আর এটা করাটাই স্বাভাবিক। এ কারণে বাংলাদেশে বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক মডালিটির উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। বাংলাদেশে বহুজাতিসত্তার বসবাসের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ভরপুর। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও অনুমান করা হয় যে, মূলধারার বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাংলাদেশে আরো প্রায় ৫০টি ভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বাস। এ সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা আলাদা ভাষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি। যদিও কালের আবর্তে ও আধুনিকতার সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে অনেক ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষা ও সংস্কৃতি আজ বিলীন হওয়ার পথে। এরপরও এখনও বাংলাদেশে যে পরিমাণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিদ্যমান রয়েছে তা সংগ্রহ করা হলে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে বিশ্বের দরবারে শিখরে অবস্থান করবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যতার পাশাপাশি রয়েছে বৈচিত্র্যতাপূর্ণ উৎসব ও পার্বণ। যদি সহজ কথায় বলা যায় তবে বলতেই হয় যে, প্রকৃত বাঙ্গালিয়ানার ধারা একমাত্র দলিত ও সংখ্যালঘুরাই টিকিয়ে রেখেছে। আমরা যারা মূলধারার মানুষ আছি তাদের বাঙ্গালিয়ানা হলো লোক দেখানো। আমরা পহেলা বৈশাখ এলে পান্তা-ইলিশ, আলু ভর্তা, শুকনা মরিচ আর পেঁয়াজ চিবিয়ে বাঙ্গালি সাজার চেষ্টা করি। কিন্তু একমাত্র দলিত ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষরাই আমাদের বাঙ্গালি ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে কোন প্রকার ভনিতা ছাড়াই। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার বাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি নতুন প্রজম্মের সামনে তুলে নিয়ে আসার জন্য নানামুখি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পহেলা বৈশাখ, বসন্ত উৎসব, নবান্ন উৎসব রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের উদ্যোগের জন্য সরকার পৃষ্ঠপোষকতা করছে। আর স্থানীয় পর্যায়ে যখন এ সকল উৎসব আয়োজন করা হয় তখন একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, অংশগ্রহণকারী, ক্রেতা-বিক্রেতা হিসাবে দলিত ও সংখ্যালঘুদের ভূমিকাই থাকে অগ্রগামী। আমি নওগাঁ জেলার কথাই বলতে পারি, এখনও অনেক দলিত ও সংখ্যালঘু মানুষ ক্ষুদ্র কুটির শিল্প তথা বাঁশ, বেত, মাটির তৈজসপত্র ইত্যাদি তৈরি ও ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলার চিরাচরিত ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বিকাশে রাষ্ট্রীয়ভাবে যে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দলিত ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী।

বাংলাদেশে যে সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহ বাস করছে দলিত জনগোষ্ঠী তাদের মধ্যে একটি। দলিত সম্প্রদায়ের সুনির্দিষ্ট কোনো সংস্কৃতি আছে কিনা সে বিষয়ে সঠিক কোন তথ্য জানা যায়নি। তবে নওগাঁয় বসবাসরত দলিত সম্প্রদায়ের মানুষরা মিশ্র ভাষায় কথা বলে থাকেন। ধর্মীয় ভাবে তাঁরা প্রকৃতি পূজার অনুসারী। মূলতঃ ধর্মীয় আচারাদি পালনের সময় তাঁরা সনাতন ধর্মকেই বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে থাকেন। সরাসরি পূজা অর্চনায় তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকলেও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা মন্ডপে গিয়ে দূর হতে তাঁরা প্রতিমা দর্শন ও ভক্তি করে থাকেন। দলিত জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো তাঁরা খুবই সাংস্কৃতিক মনোভাবাপন্ন। এলাকায় এমন কোন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উৎসব, মেলা, প্রদর্শনী ইত্যাদি খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে দল বেঁধে দলিত জনগোষ্ঠীর মানুষরা অংশগ্রহণ করে না। উৎসব যে ধর্মেরই হোক না কেন দল বেঁধে সেখানে অংশগ্রহণ করে উৎসবকে প্রাণবন্ত করার জন্য দলিতরা তাদের পবিত্র দায়িত্ব বলেই মনে করে থাকে। আর এর মাধ্যমেই নওগাঁর দলিত জনগোষ্ঠী ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে নিভৃতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। যদিও এই অবদানের স্বীকৃতি দলিত জনগোষ্ঠী স্থানীয় ভাবে পাচ্ছে না।

আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি বাংলাদেশে বহু জাতিসত্তার বাস। প্রত্যেকটি জাতিসত্তার রয়েছে আলাদা আলাদা সংস্কৃতি। সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এমন কিছু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিদ্যমান রয়েছে যার খবর কেহই রাখে না। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় দলিত সম্প্রদায় যে ভাষা ব্যবহার করছে বা যে সকল সাংস্কৃতিক উৎসব পালন করছে যারা সরাসরি দলিত জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করছেন তাঁরা ছাড়া বিষয়গুলো কেউ জানছেন না বা জানার প্রয়োজন বোধ করছেন না। দলিতদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থাকলেও কালের আবর্তে তা বিলীন হয়ে গেছে। বাংলাদেশের মূলধারার জনগোষ্ঠী এলাকায় যে সকল সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজন করছে এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করছে সেখানে দর্শক-শ্রোতা হিসাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দলিতরা আনন্দ উপভোগ করার চেষ্টা করছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের পত্নীতলা উপজেলা শাখার সভাপতি গৌতম দে জানান, এটা সত্যি যে, বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক দলিত ও পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে আমরা মূলধারার কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করতে পারি নি। এ বিষয়ে তাদের প্রতি আমাদেরও কিছু অবহেলা রয়ে গেছে। দলিতদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার বিষয়ে পরিষদের আগামী সভায় আলোচনা করা হবে এবং কিভাবে তাদের মূলধারার কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা যায় সে বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যতা এ দেশের গৌরব। তাই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যতা ও উৎসবকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সময় থাকতেই বাংলাদেশের সকল জাতিগোষ্ঠীর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে সাংস্কৃতিক মোডালিটিজগুলো খুঁজে বের করে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের অস্তিত্ব বিলীনতার হাত থেকে রক্ষা পায়। এজন্য রাষ্ট্রকেই অগ্রণী ভুমিকা পালন করতে হবে।

মো. আতাউর রহমান, পত্নীতলা (নওগাঁ) উপজেলা প্রতিনিধি, দৈনিক সকালের খবর এবং বাংলাদেশ দলিত অ্যান্ড মাইনরিটি মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সাধারণ সম্পাদক।

Facebook Comments