ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য বাজেটে কোন বরাদ্দ রাখা হচ্ছেনা

 Posted on


দলিত কন্ঠ ডেস্ক :: দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি এখনও রাষ্ট্রীয় অবজ্ঞা, অবহেলা বিদ্যমান। ২০১৯-২০ অর্থবছরের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বাজেটে আগের মতোই ধর্মীয় বৈষম্য রয়েছে। এজন্য হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে জহুর হোসেন হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিষদের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ, সহ-সভাপতি ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক, সহ-সভাপতি  মঞ্জু ধর, সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মিলন দত্ত প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
রানা দাশগুপ্ত বলেন, গত কয়েক বছরের বাজেট পর্যালোচনায় মাথাপিছু বরাদ্দের চিত্রটি করুণ ও দুর্ভাগ্যজনক। প্রকল্পবাদে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুযায়ী, ধর্মীয় সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর মাথাপিছু বরাদ্দ যেখানে ১১ থেকে ১২ টাকা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মাথাপিছু বরাদ্দ সেখানে মাত্র ৩ টাকা।
ধর্ম মন্ত্রণালয় সব ধর্ম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করতে পারছে না উল্লেখ করে রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘জনসংখ্যার ব্যাপক অংশ হিসেবে ধর্মীয় সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় অবশ্যই মোট বরাদ্দের বড় অংশ পাবে। কিন্তু মাথাপিছু বরাদ্দের ক্ষেত্রে কেন বৈষম্য হবে? আমরা মনে করি, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বাজেটে বিদ্যমান বৈষম্য রেখে দেশের ধর্মীয় সম্প্রদায়কে সমভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।’
রানা দাশগুপ্ত বলেন, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বাজেটে দেখা যায়, দেশের জেলা ও উপজেলায় ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপনে গত তিন অর্থবছরে ৮৯১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য অনুরূপ মডেল মন্দির, প্যাগোডা বা গির্জা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপনে বাজেটে কোনো বরাদ্দ নেই।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ হিসেবে হজ্জনীতি, হজ্জ প্যাকেজ ঘোষণা, দ্বি-পাক্ষিক হজ্জ চুক্তি সম্পাদন, হজ্জযাত্রীদের আবাসন ব্যবস্থাপনাসহ হজ্জ ও ওমরাহ গমন সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম গ্রহণের পাশাপাশি তীর্থভ্রমণ সংক্রান্ত কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়টিও উল্লিখিত হয়েছে। হজ্জবিষয়ক খাতে ২০১৫ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৩শ’ ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের তীর্থ ভ্রমণের জন্যে আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরেও কোনো বরাদ্দ নেই। পাশাপাশি বায়তুল মোকাররম মসজিদের জন্য ২০১৫ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মোট ৪.৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও তদনুরূপ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় উপাসনালয়সমূহকে প্রধান উপাসনালয় হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তা পরিচালনার জন্য আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরেও পূর্বেকার মতোই কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। ওয়াকফ প্রশাসন খাতে বিগত ৫ বছরে মোট ২.৭৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পূর্বেকার মতোই এবারের বাজেটে কোন বরাদ্দ নেই। ইমাম ও মুয়াজ্জিন ট্রাস্ট খাতে বিগত ৫ বছরে মোট ১১.৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পুরোহিত, সেবায়েত এবং ধর্মযাজকদের জন্য পূর্বেকার মতোই এবারের বাজেটে কোনরূপ বরাদ্দ নেই।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বাজেটে দেখা যায়, জেলা ও উপজেলায় ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ২০১৭ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট ৮৯১.৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেছে। অথচ ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্দির/প্যাগোডা/গীর্জা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের জন্য কোন বরাদ্দ নেই।
অনুরূপভাবে ইমাম প্রশিক্ষন একাডেমী খাতে বরাদ্দ থাকলেও পুরোহিত ও সেবায়েতদের প্রশিক্ষণের জন্য কোন বরাদ্দ নেই। ইসলামি মিশন প্রতিষ্ঠান খাতে বরাদ্দ রাখা হলেও খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের জন্য বাজেটে কোন বরাদ্দ রাখা হয়নি।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নিম চন্দ্র ভৌমিক বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কল্যাণে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ফাউন্ডেশন গঠন করা হোক। পাশাপাশি প্রতিবছরের বাজেটে সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আনুপাতিক বরাদ্দ নিশ্চিত করা হোক। এই বাজেটে বৈষম্য অবসান করতে ২০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়া হোক।
পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মণীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, এবারের অর্থবছরে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেট ১ হাজার ৩৩৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ইসলাম ধর্মবিষয়ক প্রকল্পেই বরাদ্দ ১ হাজার ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা। অন্য সম্প্রদায়ের জন্য বরাদ্দ ৬৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা মাত্র।
সংবাদ সম্মেলন থেকে পরিষদের পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টগুলোকে ফাউন্ডেশন করা, চলতি অর্থবছরে ২০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়া, বিগত চার দশকে বৈষম্য নিরসনে দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া, সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য শুমারি করা এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মডেল মন্দির, প্যাগোডা, গির্জা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপনে বরাদ্দ দেওয়া।

Facebook Comments