দিনাজপুর বৈশাখী মেলায় দলিত প্রসঙ্গ

 Posted on

বৈশাখী মেলার সুদর্শনা তোরণ পেরিয়ে মেলা চত্বরে দলিতদের
যাতায়াত কমই হয়। -ছবি আজহারুল আজাদ জুয়েল

আজহারুল আজাদ জুয়েল :: দিনাজপুর জেলায় প্রায় সপ্তাহব্যাপী বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হলো। বৈশাখী মেলায় নানান বৈচিত্রের দোকানপাট ছিল। বইয়ের দোকান, চুরি-ফিতার দোকান, ফুচকা আর বাদামের দোকানসহ অনেক কিছু। দু-একটি বইয়ের দোকানও ছিল্, কিন্তু কোন দোকান দলিত জনগোষ্ঠীর ছিল না। সবই মূলধারা জনগোষ্ঠীর। এখানে ঋষি, রবিদাস, হরিজন, বাঁশফোর, বেদে, হিজরা- এইসব দলিত সম্প্রদায়ের কারোই দোকান, কুটির শিল্প কিংবা অন্য কিছুই ছিল না। বৈশাখী মেলায় সপ্তাহ জুড়ে যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালা হয়েছে সেখানেও দলিতদের অংশ গ্রহণ ছিল না।
১ বৈশাখ থেকে দিনাজপুর বড় মাঠের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আড়ম্বরপুর্ণ ভাবে শুরু করা হয় বৈশাখী মেলা। জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম ফিতা কেটে ঐদিন সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিক ভাবে মেলা উদ্বোধন করেন। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আজিজুল ইমাম চৌধুরী, জেলা প্রশাসক ড. আবু নঈম মুহাম্মদ ছবুর, পুলিশ সুপার হামিদুল ইসলামসহ প্রশাসনের গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সাংস্কৃতিক কর্মীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে কয়েক হাজার মানুষের উপস্থিতি ছিল, তবে দলিত সম্প্রদায়ের কোন মানুষ ছিলেন না।

দিনাজপুর বৈশাখী মেলায় কত স্টল। একটিও দলিতদের নয়! -ছবি আজহারুল আজাদ জুয়েল

অবশ্য মেলার দ্বিতীয় দিন থেকে একটি বিশেষ দোকান দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকে। বাঁশের কারুকার্য করা ডালি, মাটি কাটা ডালি, কুলা, খাট, কচিলা, হাত পাখা, বিয়ে সাজন কুলাসহ বিভিন্ন পন্য সমৃদ্ধ দোকানটি বসেছিল মেলা প্রাঙ্গণের মাঝামাঝি স্থানে, শহীদ মিনারের সামনের বাম কর্ণারের কাছে। সেই দোকানে এইসব পন্যের সবই ছিল বাঁশের তৈরী। বাঁশের কাজের সাথে ছিল কিছুটা পাট দিয়ে তৈরী দড়ির কাজ। যেমন খাট তৈরী করা হয় বাঁশের সাথে দড়ির সমন্বয়ে। বাঁশজাত আকর্ষণীয় পন্য কিনতে দোকানটিতে প্রায় সব মুহুর্তেই ভিড় লেগে ছিল। মেলার ৬ষ্ঠ দিনে তার সাথে আলাপ হলো লেখকের।
দোকান মালিকের নাম শ্রী আনন্দ বৈশ্য। দিনাজপুর বৈশাখী মেলায় দোকান দিয়েছেন মেলার দ্বিতীয় দিন থেকে। বাঁশজাত দ্রব্য দিয়ে উৎপাদিত পণ্যের দোকান এই একটাই।
‘প্রথম দিনে দোকান বসাতে দেয় নাই। প্রথম দিনে দোকান দিতে পারলে কম পক্ষে ১০ হাজার টাকার বেচাকেনা করা যেত।’ বললেন আনন্দ বৈশ্য।
প্রথম দিনে উদ্বোধন ছিল। সেদিন ছুটির দিন থাকায় প্রচুর লোক সমাগম হয়েছিল। কিন্তু সেদিনেই মেলার লোকজন বসতে বাধা দিয়েছে। তিনি বসেছেন দ্বিতীয় দিন থেকে। দ্বিতীয় দিনে এবং তার পরের দিন গুলোতে প্রথম দিনের মত ভিড় ছিল না। ফলে বেচা কেনা কম হয়েছে। আনন্দ জানালেন, দ্বিতীয় দিন হতে প্রতিদিন দেড় হাজার হতে পাঁচ হাজার টাকা বেচা-কেনা হয়েছে তার।
কেন প্রথম দিনে বসতে দিলেন না? প্রশ্ন করা হয়েছিল বৈশাখী মেলা উদযাপন পরিষদের আহŸায়ক সফিকুল হক ছুটুকে। তিনি জানান, উদ্বোধনী দিনে যেখানে- সেখানে দোকান বসলে উদ্বোধনী কাজের ব্যাঘাত ঘটে। তাই সেদিন শুধুমাত্র তাদেরকেই বসতে দেয়া হয়েছে যারা ষ্টল বরাদ্ধ নিয়েছেন। যারা ভাসমান, ষ্টল বরাদ্ধ নেয় নাই, তাদেরকে উদ্বোধনের সুবিধার্থে প্রথম দিন মেলা প্রাঙ্গনের বাইরে রাখা হয়।
বৈশাখী মেলায় দলিতদের জন্য কোন সুবিধা ছিল কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে বৈশাখী মেলা উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আমরা মেলা করার সময় দলিত কিংবা আদিবাসী এভাবে ভাবিনা। এই উৎসব সর্বজনীন। সবাই এতে অংশ নেয়। মেলায় আসার ক্ষেত্রে, ষ্টল বরাদ্ধ নেয়ার ক্ষেত্রে কোন মাপকাঠি বিচার করা হয় না। যারা অংশ নিতে চায় তাদের সবার অংশ নেয়ার সুযোগ আছে। যে কেউ মেলায় আসতে পারে, যে কেউ আগে আসলে আগে ভিত্তিতে ষ্টল পেতে পারে।

দিনাজপুর জেলা দলিত পঞ্চায়েত ফোরাম সভাপতি কৃষ্ণা রবিদাস বলেন, বৈশাখী মেলায় আমরা যেতে পারলে যাই। তবে কোন দাওয়াত পাই না।
প্রায় একই রকম অভিমত দিলেন দিনাজপুর জেলা দলিত পঞ্চায়েত ফোরাম এর সহ-সভাপতি ভোলা রবিদাস। বললেন, মেলায় যেতে কেউ কখনো নিষেধ করে নাই। কিন্তু মেলা কমিটির উদ্যোগে পহেলা বৈশাখে যে র‌্যালি হয় সেখানে অংশ নেয়া হয় না। কারণ আমরা জানতে পারি না ঐ র‌্যালি কখন কিভাবে কোথা থেকে হবে। ঐ র‌্যালিতে হয়তো আমরাও অংশ নিতে পারতাম যদি দাওয়াত পেতাম।
বাঁশ পণ্যের বিক্রেতা আনন্দ বৈশ্য অবশ্য দাওয়াতের অপেক্ষা করেন না। তার মাথায় থাকে পহেলা বৈশাখের কথা। পহেলা বৈশাখ হলে দিনাজপুরে মেলা হবে, উৎসব চলবে সপ্তাহব্যাপী, এটা তার জানা আছে। তাই বৈশাখ আসার আগের থেকেই তার বৈশাখী প্রস্তুতিও চলতে থাকে। স্ত্রী চঞ্চলা বৈশ্যকে নিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরীতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন যেন ভাল ব্যবসা করতে পারেন।

দিনাজপুর বৈশাখী মেলায় আনন্দ বৈশ্যর সাথে আলাপচারিতায় লেখক

আনন্দ বৈশ্য প্রতি বছর বৈশাখী মেলায় নিজের উৎপাদিত বাঁশ পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন। দিনাজপুরে মাসব্যাপী যে বানিজ্য মেলা বসে, সেখানেও দোকান বসান। চৈত্র সংক্রান্তির মেলাতেও তাকে দোকানদারী করতে দেখা যায়। মেলার বাইরে প্রতি সোমবার সেতাবগঞ্জ হাটে এবং প্রতি রবি ও বৃহস্পতিবার রেলবাজার হাটে দেকান করেন। তিনি বলেন, আগে বাবার দু বিঘা জমি ছিল। এখন নাই। এখন এই ব্যবসার উপরেই চলি।
আনন্দ বৈশ্যর বাড়ি দিনাজপুর সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের রানীপুরে। রানীপুরে প্রায় দেড় শ’ বাড়ির সবাই বৈশ্য সম্প্রদায়ভুক্ত এবং ২০-৩০ ঘর ব্যতিত বাকি সকলের পেশা বাঁশ পন্য উৎপাদন ও বিক্রি করা। যে ২০-৩০ বাড়ি এই পেশায় নেই তারাও অল্প কিছুদিন আগে এ পেশাতেই ছিলেন। আনন্দের ৩ ভাই বীরবল বৈশ্য, নন্দ বৈশ্য ও চন্দ্র বৈশ্য। তারাও এ ধরণের পন্য নিয়ে বিভিন্ন হাট-বাজারে দোকান দিয়ে বেচা-বিক্রি করে থাকেন। রানীপুরের প্রায় সোয়াশত বাড়ির দুই-আড়াই শ’ লোকের ব্যবসাই হলো বাঁশজাত দ্রব্য উৎপাদনের পর বিক্রি করা। এই কাজে এই বৈশ্যদের সবাই একেক জন নিখুঁত শিল্পী। হাতের কারুকার্য দিয়ে তারা নিজেরা পন্য তৈরী ও বিক্রি করেন। অনেক পরিশ্রম করেন। তবুও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তাদের খুব একটা হয় না। তাই আর্থিক বিচারে তাকে দলিত বললে ভুল হবে না। সেই অর্থে বলা যায়, বৈশাখী মেলায় হয়তো একজন দলিতের অবস্থান ছিল।
বৈশ্য সম্প্রদায়ের লোকেরা কত কাল থেকে রানীপুরে আছেন তা তারা সঠিক ভাবে বলতে পারেন না। আনন্দের বাবা শুশীল বৈশ্য বলেন, আমরা এখানে আছি বহুকাল ধরে, দাদার আমল থেকে। বৃটিশ গেছে, পাকিস্তান গেছে, এখন বাংলাদেশ। আমরা আছি সেই কাল থেকে।

আজহারুল আজাদ জুয়েল, সাংবাদিক, কলামিস্ট, সিনিয়র রিপোর্টার- আজকের দেশবার্তা

Facebook Comments