দিনাজপুরে দলিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত নয়

 Posted on

আজহারুল আজাদ জুয়েল, দিনাজপুর :: দিনাজপুর জেলায় দলিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ব্যবস্থা মোটেও উন্নত নয়। এখানকার ঋষি সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েরা কিছুটা লেখা-পড়া করলেও হরিজন ছেলে-মেয়েরা পিছিয়ে আছে অনেকখানি। দিনাজপুর জেলার দলিতদের শিক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে কোন পরিসংখ্যান নাই। এখানে সামাজিকভাবে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কম, অভাব-অনটন জীবনের নিত্য সঙ্গী, শিক্ষাঙ্গণে প্রবেশাধিকার খুবই সীমিত, অর্থনৈতিক অবস্থানও দুর্বল। পশ্চাৎপদ, সুবিধা বঞ্চিত এই দলিত জনগোষ্ঠীর ভেতর শিক্ষিত-অশিক্ষিত ছেলে-মেয়ের সংখ্যা কত, তার পরিসংখ্যান সুনির্দিষ্টভাবে পাওয়া কঠিন। এখানে দলিতদের মধ্যেও নানা শ্রেণীর বিভাজন আছে। এদের অনেকে চরমভাবে সর্বক্ষত্রে বঞ্চনার শিকার। আবার অনেকে কিছুটা সুবিধা প্রাপ্ত। কিন্তু হরিজনদের অবস্থাটা কেমন, কত খারাপ তা একটি স্কুলের সার্বিক পরিস্থিতির মাধ্যমে বুঝে নেয়া যেতে পারে।
‘রামকৃষ্ণ আদর্শ শিশু বিদ্যালয়’ নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে দিনাজপুর জেলা শহরের বালুবাড়ীস্থ হরিজন পল্লীতে। এই পল্লীর পাশ দিয়েবয়ে গেছে ঘাঘড়া ক্যানেল। শহরের সমস্ত নোংরা, আবর্জনা এসে পড়ে এই ক্যানেলে। প্রবাহিত হয় প্রস্রাব-মল যুক্ত বিভিন্ন বাড়ি, হোটেল, দোকানের দুর্গন্ধময় নোংরা পানি। এ-রকম একটি পুঁতিগন্ধময় ক্যানেলের ধার দিয়ে হরিজন শিশুদের শিক্ষার জন্য চালু হওয়া প্রাইমারী স্কুলটিতে শিক্ষার পরিবেশ কি হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটিতে বিদ্যুৎ, ঝাড়–দার, নাইটগার্ড নাই। এখানে শুকরের উৎপাত আছে। সন্ধ্যার পর মাদকাসক্তদের আড্ডা বসে। এর বিরুদ্ধে শিক্ষকদের করার কিছু থাকে না। ঝাড়–দার নাই বলে শিক্ষকরা নিজে ঝাড়– দেন। কখনো কখনো শিক্ষার্থীদেরও ঝাড়– দিতে হয়। স্কুলের শিক্ষকরা বেতন পান না। তারা মাসে মাত্র ১২শ’ টাকা করে ভাতা পান। অর্থনৈতিকভাবে ভীষণ দরিদ্র ও বঞ্চিত এই শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের তেমন কিছু দিতে পারেন না। প্রধান শিক্ষক সর্বমঙ্গলা দেবীর মতে, বেতন না পেয়েও তারা বাচ্চাদের জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করেন। তিনি বলেন, এখানকার বাচ্চারা যেটুকু লেখাপড়া করে, তা স্কুলেই করে। স্কুল শেষে বাড়িতে পড়া দরকার। কিন্তু তারা মোটেও পড়ে না। বাড়ির গার্জিয়ানদেরও এ বিষয়ে কোন গরজ দেখা যায় না। তবে হরিজনদের চেয়ে ঋষি সম্প্রদায়ের অভিভাবকদের সচেতনতা বেশি। তাই তাদের সন্তানদের শিক্ষার হার অনেক বেশি। গত বছর এই সম্প্রদায়ের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। কারণ তাদের সন্তান মালতি রানী রবিদাস ও সাথী রানী রবিদাস গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পেয়েছিল। তাদের এই সাফল্যে তাদের পরিবার এবং দিনাজপুরের রবিদাস সম্প্রদায়সহ দলিত সমাজে আনন্দের জোয়ার এনে দিয়েছিল। ঋষিদের অনেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছে। কিন্তু সেই তুলনায় কর্ম সংস্থান না হওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। অঞ্জলী রবিদাস, যিনি এম এ পাস করেছেন, এখনো পর্যন্ত চাকরি না পাওয়ায় হতাশার মধ্যে আছেন। তিনি বলেন, কষ্ট করে পড়েছি। এখন ঘুষ দিতে পারছি না বলে চাকরি হচ্ছে না! এর পরেও শিক্ষা লাভ করতে হবে, এই অভিমত দিনাজপুর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোফাজ্জল হোসেন দুলালের। তিনি বলেন, শিক্ষার কোন বিকল্প নাই। শিক্ষিত হলে তার সুফল কোন না কোনভাবে দলিতদের ঘরে আসবেই।
– আজহারুল আজাদ জুয়েল, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট, দিনাজপুর এবং শারি’র দলিত ও মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সাধারণ সম্পাদক।

Facebook Comments