দিনাজপুরের জনপ্রিয় কবিগান এখন আকাশ সংস্কৃতির কোপানলে

 Posted on

আজহারুল আজাদ জুয়েল, দিনাজপুর :: রাত গভীর হয়। একদল লোক জেগেই থাকেন। তারা মন্ত্রমুগ্ধের মত দু’জন কবির বাদ-বিবাদ শোনেন। বাদ-বিবাদ হয় যুক্তিতে, কবিতায়, কাব্যিক ছন্দে, সুরের মুর্ছনায়। একে বলে কবিগান। দিনাজপুর জেলায় বিভিন্ন উৎসবে কবি গানের আয়োজন করা হয়। এটা হলো ছন্দে ছন্দে দু’জন কবির কাব্যিক লড়াই। একজন হয়ত কবিতার ছন্দে বলছেন পরিবেশ রক্ষার কোন দরকার নাই। এই বক্তব্যের স্বপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরছেন কবিতার ছন্দে। সেই সাথে ভাঁজছেন সুর। সুরের তালে, কবিতার ছন্দে, যুক্তির আলোয় বলছেন পরিবেশ রক্ষার জন্য মানুষের কোন করণীয় নেই। যা করবেন সব সৃষ্টিকর্তাই করবেন। অপর কবি এর পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলছেন, সৃষ্টিকর্তাতো সুন্দর পরিবেশই দিয়েছেন। আকাশ, বাতাস, বৃক্ষ, ফুল, পাখি, নদী, পাহাড়, ঝর্ণা দিয়েছেন। কিন্তু এই সুন্দর পরিবেশকে নানান কুকর্ম দ্বারা মানুষই ধ্বংস করেছে এবং এখনো করছে। পরিবেশ দূষণ ঘটিয়ে মানুষ নিজেদের বিপদ নিজেরা ডেকে আনছে। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে মানুষের উচিত সৃষ্টিকর্তা যা দিয়েছেন তা ধরে রাখা, রক্ষার চেষ্টা করা। এভাবে চলে কবির লড়াই। বৈশাখী উৎসবে, চৈতালী অনুষ্ঠানে, পুজো-পার্বনে, বিভিন্ন মেলায়, ভারাইটি শো’য়ে কবিগানের আয়োজন দেখা যায় দিনাজপুরে। যারা এই গান পরিবেশন করেন সাধারণভাবে তাদেরকে কবিয়াল বলে। প্রত্যেক কবিয়াল তার নামের শেষে সরকার পদবী যোগ করে থাকেন। সরকার মানে তিনি একজন কবিয়াল। দিনাজপুরে এরকম একজন কবিয়ালের নাম মোঃ মাহফুজুল ইসলাম। ডাক নাম বাবু। কিন্তু কবিয়াল হওয়ার পর নিজের নামের সাথে ‘সরকার’ যোগ করে হয়েছেন বাবু সরকার। এখন কবিয়াল বা কবি গানের শিল্পী হিসেবে বাবু সরকার বেশ পরিচিত। বাবু সরকার পেশায় দর্জি। বাড়ি চিরিরবন্দর উপজেলার লক্ষীপুরে। পিতা আব্দুল হামিদ সরকার, মা মনোয়ারা খাতুন। ৩৯ বছর বয়সী মাহফুজুল আলম জানালেন, প্রায় ১০ বছর আগে ওঁকড়াবাড়িতে কাহারোলের ক্ষিতিশ সরকার ও মালতি সরকার কবিগান পরিবেশন করেছিলেন। সেই গান শুনে এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, নিজেই কবিয়াল হওয়ার জন্য উতালা হয়ে পড়েছিলেন। তিনি ধর্না দিয়েছিলেন ক্ষিতিশ সরকারের কাছে। তাকে বাড়িতে দাওয়াত খাইয়ে, উপধৌকন দিয়ে তালিম নিয়েছিলেন কবি গানের। এই পুজোয় কবিয়াল বাবু সরকার ভীষণ ব্যস্ত। তিনি জানালেন, শারদীয় দূর্গোৎসব উপলক্ষে ১১দিনের প্রোগাম কনফার্ম করে ফেলেছেন। আগাম টাকাও নিয়েছেন। ১৬ অক্টোবর পার্বতীপুরের খোলাহাটি সংলগ্ন বাগবারে চন্দনা রানীর সাথে, ১৭ ও ১৮ অক্টোবর রানীশংকৈলের দেবরাজ এলাকায় কাজল রানীর সাথে, দশমীর রাতে চিরিরবন্দরের চম্পাতলীতে মিনতি রানীর সাথে, একাদশীর রাতে ১৩ মাইল গড়েয়ায় মুক্তি রানীর সাথে, লক্ষী পুজার রাতে চিরিরবন্দরের তালপুকুর-বাজিতপুরে মালতি রানীর সাথে, এর পরদিন আমতলীর বেজট্টিতে চন্দনা রানীর সাথে, এরপর নবাবগঞ্জের আফতাবগঞ্জে যশোদা রানীর সাথে, কালিপুজার রাতে দিনাজপুর সদরের গোসাইপুরে হরিপ্রিয়ার সাথে এবং কালিপুজার পরদিন রুহিয়ার ঢোলেরহাটে পুর্ণিমা রানীর সাথে কবিগান পরিবেশন করবেন বাবু সরকার। তাকে সহযোগিতা করবেন আরেক কবিয়াল চিত্তরঞ্জন সরকার। দিনাজপুর জেলায় বাংলাদেশ চারণ কবি সংঘ নামে তাদের নিজস্ব একটি সংগঠন আছে। সংঘের প্রধান কার্যালয় করা হয়েছে দিনাজপুরের বিরলে। শাখা আছে চিরিরবন্দর, বীরগঞ্জ, সেতাবগঞ্জ, কাহারোলে। বাংলাদেশ চারণকবি সংঘের সভাপতি এম এ কুদ্দুস পেশায় একজন সাংবাদিক। থাকেন দিনাজপুরের বিরলে। তিনি জানালেন, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, বগুড়া, রংপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোরসহ সারা দেশে সংঘের সদস্য আছেন ৫০৪ জন। এর মধ্যে মেয়ে সদস্য আছেন ১১৭ জন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কবিয়াল বা চারণ কবিরা বাংলাদেশের পক্ষে বিভিন্ন স্থানে প্রোগ্রাম করতেন বলে জানা যায়। চিরিরবন্দরের কবিয়াল নকুল সরকার মারা গেছেন পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ইন্ডিয়া গিয়েছিলেন। যুদ্ধ চলাকালে বাড়ি-ঘর দেখার জন্য একদিন ইন্ডিয়া হতে বাংলাদেশে প্রবেশের পর চিরিরবন্দরের লক্ষিতলায় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়েন। পাকিস্তানি সেনারা পেছন থেকে গুলি করে। সাথে সাথেই মারা যান নকুল সরকার। মুক্তিযুদ্ধে যাদের রক্ত ঝরেছে, সেই কবিয়ালদের দিনকাল এখনো খুব একটা ভাল যাচ্ছে না। তাদের উন্নয়নে পরিকল্পনা দরকার।

আজহারুল আজাদ জুয়েল, সিনিয়র রিপোর্টার, আজকের দেশবার্তা, শারি’র দিনাজপুর জেলা মিডিয়া ডিফেন্ডার এবং মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম এর সভাপতি ।

Facebook Comments