দলিত নারীর জীবন সংগ্রাম : জীবনমান পাল্টাতে ব্যস্ত গাইবান্ধার শতাধিক দলিত কিশোরী ও গৃহবধূ

 Posted on

মাহমুদুল গনি রিজন, গাইবান্ধা : চিকন লোহার ফ্রেমের উপর বেতের রশি দিয়ে ঢেকে দৃষ্টিনন্দন রপ্তানীযোগ্য বাস্কেট বানিয়ে দলিত কিশোরী ও গৃহবধূরা জীবন সংগ্রামে নেমে জীবন মান উন্নয়নে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন। সংসারে বাবা মায়ের পাশাপাশি বেতের তৈরি বাস্কেট বানিয়ে অর্জিত অর্থ দিয়েই নিজেদের পড়াশোনা, বাবা মায়ের অভাব অনটনের সংসারে নিজেরা কিছু অর্থ সহযোগিতা করতে পেরে ভীষণ আনন্দিত তারা। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নারীদের পাশাপাশি গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের মদনেরপাড়া গ্রামে প্রায় শতাধিক দলিত রবিদাস সম্প্রদায়ের কিশোরী ও গৃহবধূরা এই বাস্কেট তৈরি করছেন। ক্রাপটস্ ভিলেজার্স লিমিটেড নামের একটি রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী বেতের তৈরি বিভিন্ন সাইজের ১১ ধরনের বাস্কেট বানান তারা।

ফুলছড়ি উপজেলার চন্দিয়া মহিলা কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমি রানী রবিদাস বলেন, অনেক দিন ধরে সে পড়াশোনার পাশাপশি এই কাজ করে আসছে। প্রতি সপ্তাহে সে বিভিন্ন সাইজের ৫০-৬০টি বাস্কেট বানায়, মাসে তার ২৫০-৩০০টি বাস্কেট বানানো হয়। এথেকে তার মাসে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় হয়। যা দিয়ে সে নিজের পড়াশোনা, কাপড় চোপড় বানিয়েও কিছু টাকা তার বাবা মাকে সংসার খরচে সহযোগিতা করতে পারে। তার মা ল²ী রানীও সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে বাস্কেট বানানোর কাজ করে থাকেন। আগের চাইতে তাদের সংসার এখন অনেক ভালো চলে।

একই গ্রামের শ্যামলী রানী বাবা শনিচরন রবিদাস, মা সন্ধ্যারানী রবিদাসের মেয়ে। কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের এম ইউ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী শ্যামলী, সে বাস্কেট বানানোর কাজ করে অনেক দিন ধরে। প্রতি সপ্তাহে সেও বিভিন্ন সাইজের ৫০-৬০টি বাস্কেট বানায়, মাসে তার ২৫০-৩০০টি বাস্কেট বানানো হয়। এথেকে মাসে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা তার আয় হয়। নিজের স্কুলের বেতন দিয়ে সে বাবা মাকে বাকি অর্থ দিয়ে দেয়। তাদের সংসারও আগের তুলনায় এখন অনেক ভালো চলে।

এ ছাড়াও এসএসসি পরীক্ষার্থী চন্দনা রবিদাস, কঞ্চিপাড়া নজরুল হক আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষাথী সুমনা রানী রবিদাস এরা সকলেই এই কাজের সাথে যুক্ত।
পৈত্রিক পেশা ছেড়ে ভ্যান চালান ওই গ্রামের সুকলাল রবিদাস। দুই সন্তান আর স্ত্রী জোছনা রানী রবিদাস। চারজনের টানাপোড়নের সংসার ছিল তার। বছর খানেক আগে তার স্ত্রীও এই বাস্কেট বানানোর কাজে যুক্ত হন। ফলে এখন তার সংসার আগের তুলনায় অনেক ভালো চলে।

জোছনা প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন সাইজের ৪০-৫০টি বাস্কেট বানান, মাসে তার ২০০-২৫০টি বাস্কেট বানানো হয়। এথেকে তার মাসে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা আয় হয়। যা দিয়ে সে নিজের প্রয়োজনীয় ছোটখাট সমস্যা মিটিয়েও দুই ছেলের জন্য কিছু খরচ করতে পারেন।

এ ছাড়াও ওই গ্রামের কেয়া রানী রবিদাস, ববিতা রানী রবিদাস, বিউটি রানী রবিদাস, হাসি রানী রবিদাসও একই কাজের সাথে যুক্ত।

এ প্রসঙ্গে ‘বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলন’ এর গাইবান্ধা জেলা সাধারণ সম্পাদক খিলন রবিদাস অন্যান্য সম্প্রদায়ের নারীদের পাশাপশি দলিত অবহেলিত নারীদের বাস্কেট বানানোর কাজে সুযোগ করে দেয়ার জন্য ক্রাপটস্ ভিলেজার্স লিমিটেড প্রতিষ্ঠানের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আমরা যেখানে পুরষরাই কাজের সুযোগ কম পাচ্ছি সেখানে নারীরা ঘরে বাস্কেট বানিয়ে অর্থ উপার্জন করে পরিবারের আয়ের উৎস হয়ে উঠছেন। এই সুযোগ করে দেয়ার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কৃতজ্ঞ।”

ক্রাপটস ভিলেজার্স লিমিটেড প্রতিষ্ঠানের জেলার ইনচার্জ বিপ্লব দাস জানান, ছয় বছর আগে তাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এ এলাকার কিছু নারীকে বাস্কেট বানানোর ট্রেনিং করে এই কাজ শুরু করা হয়। তাদের প্রতিষ্ঠানের বিদেশে রপ্তানীর জন্য ১১ ধরনের বাস্কেট বানিয়ে দেন এসব নারীরা। বর্তমানে ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের মদনের পাড়া, বালাসি, কেতকির হাট, গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের ফলিয়া, পুলবন্দি, গিদারি ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামের প্রায় ৮ শত নারী এই বাস্কেট বানানোর কাজে যুক্ত আছেন। শুরুতেই তারা এ বিষয়ে গ্রæপ করে ট্রেনিং এর আয়োজন করে। বাস্কেটের জন্য যে কাচামাল অর্থাৎ লোহার তৈরি ফ্রেম ও বেত তারাই সরবরাহ করেন সেজন্য তাদের কোন পুঁজি লাগে না এবং খুব অল্প সময়ে তারা বাস্কেট বানানোর এই কাজটি শিখতে পারে। এছাড়াও ঘর সংসারের কাজ করেও বাড়িতে বসেই এই কাজটি করা সম্ভব। তাই ধীরে ধীরে এই কাজের সাথে এই এলাকার নারীরা বেশি যুক্ত হয়ে পড়ছেন।

মাহমুদুল গনি রিজন, জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক সংবাদ, রেডিও টু-ডে, সদস্য, বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম।

Facebook Comments