দলিত নারীর জীবনের গল্প

 Posted on


মাহাবুব চান্দু, মেহেরপুর :

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দলিত নারীদের জীবনাচার, নির্ভরতা, দৈনন্দিন জীবন-সংগ্রাম, অভ্যাস বেশ বিচিত্র এবং নিজস্ব কৃষ্টি সংস্কৃতিকে ঘিরে এগিয়ে চলার নানান গল্প আছে তাদের জীবনে। দলিত নারীর মমত্ববোধ, তাদের আকাঙ্খা, স্বপ্ন, বেদনা, হতাশা, দেশ, কাল, সমাজ, ভাষা সবকিছু মিলে সহজ সরল এই মানুষগুলোর জীবন সংগ্রাম যেন একেকটি ছোট গল্প।

বর্তমান সময়ে সমাজ কিছুটা বদলেছে মনে হলেও নারীর প্রতি এমন কিছু আচরণ বর্ণনায় শিউরে উঠতে হয়। তবুও কেউ কেউ প্রথার কঠিন শিকল ভাঙতে পারে। অবশ্য তার জন্য তাকে অনেক মূল্যও চোকাতে হয়। দলিত মেয়েদের উপর সামাজিক অত্যাচারের নগ্নচিত্রও আমরা দেখতে পাই। ১৩-১৪ বছরের মধ্যে বিয়ে হচ্ছে প্রায় সকল মেয়ের। বসবাসের স্থানগুলো দেখলে খুবই অমানবিক লাগে। দলিত সম্প্রদায় সমাজের অচ্ছুত শ্রেণী হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। মেহেরপুরে দলিত নারীদের জীবন সংগ্রাম নিয়ে সরেজমিনে কথা হয় অনেকের সাথে।

ফুলকুমারী বাঁশফোড় বলেন, “আমার বিয়ের পর আমার পরিবারে কষ্ট ও অভাব চলে। তখন অভাব ছিল ভালো খাবারের, কাপড়ের, অভাব ছিল রাত কাটানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গার। মানুষের বাড়ির বারান্দা, হাসপাতালের বারান্দায় রাত কাটিয়েছি। এ অভাব দূর করার জন্য হাতে ঝাঁটা ধরি। প্রায় ৯ বছর হাসপাতালে কাজ করেছি। ঐ সময় গ্রামীণ ব্যাংক নামে এক এনজিও হতে ১০ হাজার টাকা লোনের মাধ্যমে আমার নতুন জীবনের যাত্রা শুরু। সেই টাকা দিয়ে কয়েকটি ছাগল, কয়েকটি হাঁস-মুরগি পালন করি। এক সময় ২ টা গরু কিনতে সক্ষম হই। পরে খড়ির ব্যবসা করেছি। তারপরও পৌরসভায় রাস্তা পরিচ্ছন্ন করার কাজ করি। এ কাজে আমার স্বামী ও সন্তানেরা সাহায্য করে। আমি আমার সন্তানদের লেখাপড়া করিয়েছি। বর্তমানে আমি রিক্সার গ্যারেজ, বাসার কাজ, পৌরসভার কাজ, অফিসের কাজ করে আমার পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করছি।” হরিজন কলোনীর প্রায় ৪৫জন মহিলা পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে পৌরসভায় কাজ করে বলে জানান রিনা বাঁশফোড়। এভাবে নারীরা পরিবারের আর্থিক কাজে সাহায্য করে যাচ্ছে।

পুতুল বাঁশফোড় বলেন, “আমার স্বামী পৌরসভায় চাকরি করে। আমি বাসা বাড়িতে কাজ করি। পৌরসভায়, দোকান-পাটে ঝাড়–দারের কাজ করি। আমার কোন জায়গা না থাকায় অন্য মহিলাদের সাথে শেয়ারে পশু পালন করি। আমার মেয়ে সেলাই মেশিনে কাজ করে তার পড়াশোনার খরচ চালায়। সে মহিলা কলেজে ইন্টার পড়ছে।”

সোনিয়া বাঁশফোড় বলেন, আমার পরিবারের ১৩ জন সদস্য। আমার ৭ টা ছেলেমেয়ে। আমার স্বামীর কোন চাকরি নেই। হার্টে সমস্যার কারণে কোন কাজ করতে পারেনা। তাই পরিবারের সকলের ৩ বেলা খাবারের জন্য ঝাাঁটা ধরি। বাসস্ট্যান্ডে টয়লেট পরিষ্কার করে পরিবারের আহার জোগাড় করি।”

দলিত হরিজন সমাজে কিশোরীদের কথাঃ

বিউটি রানী বাঁশফোড় (১৪) বলেন, “আমরা ৪ ভাইবোন। আমাদের বাড়িতে ১টা ঘর। তাই আমরা ২ বোন আর মা ঘরে ঘুমাই, বাবা ও ভাই বাইরে বারান্দায় ঘুমায়। শীত ও বর্ষায় অনেক কষ্ট হয়।”

সুস্মিতা রানী বাঁশফোড় (১৫) বলেন, “আমাদের গোসল করতে কষ্ট হয়, লজ্জাবোধ হয়। গোসল করার জায়গা ঘেরা নেই। টয়লেটে যেতে হলে লজ্জায় পড়তে হয়। কারণ টয়লেটে পানির ব্যবস্থা নেই। তাই বদনা নিয়ে পাড়ার মানুষের সামনে দিয়ে যাওয়া লাগে।”

রেখা বাঁশফোড় (১৬) বলেন, “আমাদের পাড়ার জায়গা কম। তাই কাপড় মেলার জায়গা থাকে না। আমাদের নিজস্ব কোন ঘর নেই। মাসের বিশেষ দিনে মেয়েদের কিছু কাপড় ব্যবহার করতে হয়। সেই কাপড়গুলো ধুয়ে মেলে দেওয়ার কোন জায়গা পাই না। বাইরে মেলতে লজ্জায় পড়তে হয়। তাই রাতে চুলার আগুনে কাপড়গুলো শুকাতে হয়।”

সুখী দাস, মেহেরপুরের বামনপাড়ার দাস কলোনির বাসিন্দা। স্বামীর নাম সুব্রত দাস। সংসারের অর্থ উপার্জনে ভূমিকা রাখছে সুখী দাস। বাঁশ দিয়ে তৈরি করেন নানা রকম গৃহস্থালি পণ্য। টুকা, শরপস, ঝুড়ি, খাচাসহ আরও অনেক কিছু। আসছে আম মৌসুমের জন্য নিজ হাতে বানাচ্ছেন আমের ঝুড়ি। পুরুষদের পাশাপাশি সমান তালে কাজ করে যাচ্ছেন সুখী দাস। মাস শেষে ৬-৭ হাজার টাকা রোজগার হচ্ছে সুখীর। কিন্তু কাজের পরিবেশসহ নানান প্রতিক‚লতার মধ্য দিয়ে এই আয় রোজগারটি করতে হয় তাকে। প্রায় ১৫ বছর আগে বিয়ে হয় সুখীর, রয়েছে দুই ছেলে। একজনের বয়স ১৩ আরেক জনের ৭। বড় ছেলেও লেখাপড়ার পাশাপাশি বংশগত এই কাজে সহযোগিতা করে। একই পাড়ার আরেকজন নারী পবি রানী দাস এই পেশায় নিয়োজিত থেকে একই কথা বলেন।
রাধা রানী বেদ বাস করেন মল্লিকপাড়ার একটি ভাড়া বাড়িতে। স্বামী কাঙাল চন্দ্র বেদ পাখি ধরে বিক্রি করেন দীর্ঘদিন থেকে। ঘরে একটি তালাকপ্রাপ্তা মেয়ে আছে। বাঁশের কাজ ছাড়া অন্য কাজ এরা জানে না। রাধা রানী বলেন, “প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাঁশের কাজের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। স্বামী পাখি ধরতেও আর যেতে পারেনা। কারণ আইন বিরোধী বলে পুলিশ ঝামেলা করে। সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয় আমাদের।”
সামাজিক হেনস্তার শিকার হতে হয় কিনা জানতে চাইলে আরেক কারিগর লিপি দাস বলেন, “কখনো কখনো হতে হয়। আমাদের অন্য মানুষরা খাটো করে দেখে। পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েদেরও উপার্জন করতেই হয়, তা নাহলে সংসার চলেনা।”
দলিত পরিবারের অর্থনীতিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একই সাথে প্রজনন রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচর্যাসহ সংসারের খুঁটিনাটি সকল বিষয়ে তদারকি করতে হয় নারীদের। এই নীরব অবদানের অর্থমূল্যও কম নয়, প্রতিনিয়ত নারীরা চেষ্টা করছে তাদের সন্তানেরা তাদের চেয়ে ভালো মানের জীবন যাপন করুক। কবে তাদের এই সংগ্রাম শেষ হবে, তারা কেউ জানে না !

মাহাবুব চান্দু, সাধারণ সম্পাদক, জেলা প্রেস ক্লাব, জেলা প্রতিনিধি, ইত্তেফাক এবং বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments