দলিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের মূল দায়িত্ব সরকারের

 Posted on


হেমায়েত উদ্দিন হিমু, ঝালকাঠি : দলিতরা এ দেশেরই মানুষ। এখানকার আলো-বাতাসেই তারা বেড়ে ঊঠছে। তাদের বাদ দিয়ে দেশের সার্বিক কল্যাণ কখনো সম্ভব নয়। আমাদের সংবিধানেও সবার সমান অধিকার নিশ্চিতের কথা রয়েছে। পিছিয়ে পড়া এ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারকেই মূল দায়িত্ব নিতে হবে। এজন্য জরুরিভাবে বর্ণবৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন, জাতীয় বাজেটে দলিতদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা, দলিত ও হরিজন সন্তানের শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় ও জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়নসহ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পিত কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
জন্ম ও পেশাগত কারণে যারা বৈষম্য এবং বঞ্চনার শিকার, তারাই ‘দলিত’ নামে পরিচিতি। দলিত মানুষের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য রয়েছে। তাদের মধ্যে দুটি ভাগ রয়েছে। একটি বাঙালি এবং অপরটি অবাঙালি দলিত। এরা সমাজে ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবেই পরিচিত। আমরা অনেকেই তাদের ‘মানুষ’ হিসেবে মেনে নিতে পারি না। এখনো তারা মূল¯্রােতে আসতে পারেনি। দুঃখ-কষ্টের মধ্যেই চলছে তাদের জীবনধারা। বর্তমান সরকার তাদের সার্বিক কল্যাণে বেশকিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলানায় কম।
বাঙালি দলিতদের মধ্যে রয়েছে : চর্মকার, মালাকার, কামার, কুমার, জেলে, পাটনী, কায়পুত্র, কৈবর্ত, কলু, কোল, কাহার, ক্ষৌরকার, নিকারী, পাত্র, বাউলিয়া, ভগবানীয়া, মানতা, মালো, মৌয়াল, মাহাতো, রজদাস, রাজবংশী, রানা কর্মকার, রায়, শব্দকর, শবর, সন্ন্যাসী, কর্তাভজা, হাজরা, জোলা, হাজাম, বেদে, বাওয়ালী ইত্যাদি। এসব সম্প্রদায় আবার বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত। অন্যদিকে, অবাঙালি দলিত বলতে ভারত থেকে বিভিন্ন সময়ে আসা পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতাকর্মী, চা বাগানের শ্রমিক, জঙ্গল কাটা, পয়ঃনিষ্কাশন কাজে আশা জনগোষ্ঠীকে বোঝায়। অসহায় ও অভাবী এই মানুষ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করছে। তারা ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : মুচি, ডোম, হেলা, বাল্মিকী, রবিদাস, ডোমার, ডালু, মালা, মাদিগা, চাকালি, সাচ্চারি, কাপুলু, নায়েক, নুনিয়া, পরাধন, পাহান, বাউরি, বীন, বোনাজ, বাঁশফোর, ভূইয়া, ভূমিজ ও লালবেগী। এদের মধ্যে হেলা, মুচি, বাঁশফোর, বাল্মিকী, রবিদাস, ডোম, ডোমার প্রভৃতি ‘কানপুরী’ হিসেবে পরিচিত। এরা নিজেদের ‘হরিজন’ পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান না থাকায় জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। বাজেটের সময় ক্ষুদ্র সংখ্যার জনগোষ্ঠীর যেমন, বেদে ও হিজরাদের সাথে মিশিয়ে বরাদ্দ রাখা হয়। ফলে এ সম্প্রদায়ের বিরাট অংশ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার ও উন্নয়নে উপেক্ষিত। দলিত, হরিজন ও ও বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তাদের উন্নয়নের জন্য মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ দরকার। এটা না হলে তারা অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চিত থেকে যাবে। সরকারের পঞ্চম বার্ষিকী পরিকল্পনায় দেশের দলিত, হরিজন জনগোঠীর সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য যথাযথ কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করার কথা থাকলেও তা সেভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তাদের স্বার্থ ও অধিকার সম্পর্কিত কোন নীতি বা আইন নেই। এই জনগোষ্ঠীর জন্য ‘বৈষম্য বিলোপ খসড়া আইন ২০১৪’ করা হলেও এখনও তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এজন্য নতুন করে উদ্যোগ নেয়া দরকার।
সমাজসেবা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ঝালকাঠি জেলায় দলিত, হরিজন ও বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ভাতা কার্যক্রম ও শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে চলমান রয়েছে। জেলার ৪টি উপজেলায় বর্তমানে ২২৪ জনকে ভাতা প্রদান কার্যক্রম এবং ১৭৫ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রমের আওতায় নেয়া হয়েছে। এরমধ্যে সদর উপজেলা ও জেলা শহরে ৫৪ জনকে ভাতা ও ৪৬ জনকে শিক্ষা উপবৃত্তি, নলছিটি উপজেলায় ৬০ জনকে ভাতা ও ৬৯ জনকে শিক্ষা উপবৃত্তি, রাজাপুরে ৫০ জনকে ভাতা ও ১৯ জনকে শিক্ষা উপবৃত্তি এবং কাঁঠালিয়া উপজেলায় ৬০ জনকে ভাতা ও ৪১ জনকে শিক্ষা উপবৃত্তি দেয়া হচ্ছে। এরমধ্যে ভাতাভোগীরা মাসিক ৫০০ টাকা হারে সহায়তা পাচ্ছেন। অন্যদিকে, শিক্ষা উপবৃত্তি দেয়া হচ্ছে ৪টি গ্রæপে। যার মধ্যে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা মাসিক ৩০০ টাকা, মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা মাসিক ৪৫০ টাকা, উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা মাসিক ৬০০ টাকা এবং ¯œাতক শিক্ষার্থীরা মাসিক এক হাজার টাকা হারে বৃত্তি পাচ্ছে। দলিত সম্প্রদায় উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ, ঝালকাঠি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ কুমার ভক্ত জানান, বর্তমান সরকার তাদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ঝালকাঠি হরিজন পল্লীতে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন আবাসভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করার সুযোগ পাচ্ছে। আরও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। অন্যদিকে, চাকরি ক্ষেত্রে প্রকৃত হরিজনরা অনেক সময় হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। পেশাদার হরিজনের বদলে অন্যদের কাজ দেয়া হচ্ছে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সেই বৈষ্যম্যহীন, সুখী, সমৃদ্ধ সোনার বাংলা আজও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। এজন্য সরকারকে অসহায়, অবহেলিত, বঞ্চিত দলিত জনগোষ্ঠীর পাশে থাকতে হবে। তারা যাতে ‘নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে’ নিজেদের জীবন বদলে দেয়াসহ দেশ ও জাতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে তার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

হেমায়েত উদ্দিন হিমু, সম্পাদক, সূর্যালোক নিউজ ও জেলা প্রতিনিধি, বিটিভি, ঝালকাঠি এবং সদস্য, বাংলাদেশ দলিত  এন্ড মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম, শারি

Facebook Comments