দলিত জনগোষ্ঠির বিকল্প কর্মসংস্থান

 Posted on

নূর-ই-হাসিন্ দিশা :: ” তোমহারে ছরিল কাটিলে যে অক্ত বাইর হোবে হামারে ছারিল কাটিলে একে অক্ত বাইর হোবে। ক্যানে হামারে সাত এমুন বিভার হ্যায়?” কথাগুলো ছিলো কল্পনার। যার অর্থ দাঁড়ায় ” তোমার শরীর কেটে গেলে যেমন রক্ত বের হবে আমার শরীর কেটে গেলেও একই রকম দেখতে রক্ত বের হবে। আমাদের সাথে তবে এমন ব্যবহার কেনো করা হয়?” একজন কল্পনার বলা কথাগুলোই সকল কল্পনার কথা। দলিতদের জীবনমানের কোনো উন্নয়ন চোখে পড়েনা। বেশ কিছু এনজিও,সামাজিক সংগঠন তাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে এলেও পরিবর্তন হয়নি তাদের জীবনের।
দলিত জনগোষ্ঠির আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচয় হরিজন বা দলিত। কোথাও সুইপার বা মেথর। ক্ষুদ্র জাকিস্বত্তার মূল আবাস ভারতের আলপ্প প্রদেশ। বৃটিশ সরকার পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বা এবং পয়:নিস্কাশন কাজের জন্য এদের ঢাকা শহরের গোড়া পত্তনের সময় নিয়ে আসে। লোকবসতি বেড়ে যাওয়ায় ঢাকা মিউনিসিপ্যালটি গঠন হয়। সেই সময়ের অল্পকিছু পরিবার থেকে শত শত পরিবার, হাজার হাজার মানুষ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ। নাগরিক হিসেবে ভোটাধিকার থাকলেও বাঙালী সমাজের সাথে দলিতদের ওঠাবসা নেই। সমাজে তাদের পরিচয় অচ্ছুৎ হিসেবে। যার ফলশ্রুতিতে সমাজের সর্বস্তরে তারা নিগৃহীত। চায়ের দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁয় খাবার কেনার সামর্থ থাকলেও তাদের কাছে খাবার বিক্রি করা হয়না। রাস্তার চায়ের দোকানে চা নিতে হলে প্রায়ই নিজস্ব স্টিলের মগে অথবা গ্লাসে চা নিতে হয় এবং উপর থেকে চা ঢেলে দেয় দোকানীরা।
দলিতদের কর্মসংস্থান করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষার। সরকারের মূলনীতি সবার জন্য শিক্ষা হলেও খুব বেশি দূর এগুতে পারেনা শিশুরা। বাবা মায়ের ইচ্ছায় স্কুলে গেলেও পরিবেশগত কারণে অল্প কিছুদিনের মধ্যে স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
নিজেদের পেশাকে শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করলেও বর্তমানে অনেকেই বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে ঘুরছে। পেশা পরিবর্তন করলেও অথবা অন্য চাকরিতে অংশ গ্রহণ করলেও মূল পরিচয় শোনার পরে চাকরি আর হয়ে ওঠেনা। দলিত জনগোষ্ঠির পেশাকে আবার অনেক বাঙালী নিজেদের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। যেমন: ক্লিনার, রোড ক্লিনার ইত্যাদি। এর ফলেও বেড়ে চলেছে বেকারত্ব।
বিভিন্নভাবে দলিতদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। স্কুলেই তাদের বিভিন্ন টেকনিক্যাল কাজ শেখানো যেতে পারে। প্রযুক্তিগত শিক্ষায় শিক্ষিতকরণ, পশুপালন, হাঁসমুরগী পালন, মৎস্য চাষ, শোপিস তৈরি, ব্লক, বাটিক, সেলাই, দর্জিবিদ্যা এসব কাজে তাদের পারদর্শী করে তোলা দরকার। শুধু তাইই নয়, কাজ শিখিয়ে তাদের কর্মের স্থায়ী ব্যবস্থা করে দেয়ার বিষয়েও লক্ষ্য রাখতে হবে। হরিজন বা দলিতদের পেশা বদল করা গেলে ধীরে ধীরে শ্রেণি বৈষম্যও কমে আসবে।
এনজিও পরিচালিত কিছু কিছু স্কুল দলিত শিশুদের গান, নাচ এসব শেখানোর ব্যবস্থা করলেওবিভিন্ন অনুষ্ঠানে দলিত হিসেবে পরিচয় করানো হলে পরবর্তীতে এসব শিশু লজ্জা পায়।
যাদের হাতের ছোঁয়া না হলে নগর, বাজার, অফিস, আদালতপাড়া বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, সেই দলিত বা হরিজনরা এ সমাজেরই মানুষ।
সোনালী, আল্পনা, অন্তরা স্বপ্ন দেখে তারা তাদের পূর্বপুরুষের পেশা নয়, সমাজের আর দশজনের মতো কাজ করবে। তাদের সন্তানেরা পেশা বদল করে স্বাভাবিকভাবে সমাজের দশজনের মতো বেড়ে উঠবে। তা নইলে হতাশায়, দুঃখে, বেদনায় পূর্বপুরুষদের মতো দুঃখ ভুলতে হয়তো নেশায় বা চুয়ানিতে বুঁদ হবে।
আমাদের সমাজের এই পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদেরকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। তারা আমাদের মতোই রক্ত মাংসে গড়া। কল্পনার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে তাই বলি,
“তোমার ছারিল কাটিলে যে অক্ত বাইর হোবে আমার ছারিল কাটিলেও একে অক্ত বাইর হয় কল্পনা।” তাই, উপযুক্ত বিকল্প কর্মসংস্থান করা হোক দলিতদের, ঘুচে যাক বৈষম্য।
ডা. নূর-ই-হাসিন্ দিশা, সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী।

Facebook Comments