তাঁত শিল্পে কর্মরত আপুচি বালারা মজুরি বৈষম্যের শিকার : নারী তাঁত শ্রমিকদের জন্য নীতিমালা দাবী

 Posted on

স্বপন মির্জা-সিরাজগঞ্জ :
সিরাজগঞ্জের সমৃদ্ধশালী তাঁত শিল্পের প্রসারে যারা মূল ভুমিকা পালন করেন তারা নারী শ্রমিক। একটি শাড়ী বা লুঙ্গী তৈরিতে ৯টি ধাপের মধ্যে ৬টি পর্যায়েই মূল ভূমিকায় দলিত নারী আপুচি বালাদের মতো জেলার লাখো নারী শ্রমিক পুরুষের চেয়ে মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। যুগ-যুগ ধরে চলা এমন নিয়মে জেলার কর্মজীবি নারীরা পুরুষদের মতো সমান তালে কাজ করলেও তাদের চেয়ে ৩ ভাগের ১ ভাগ মজুরি পাচ্ছেন। তারা মহাজনদের বলেও কোন সুরাহা পাচ্ছেন না। আর তারা নারী অধিকার তথা নারী দিবস সম্পর্কেও কিছু জানেনা। এক্ষেত্রে নারীর মজুরি বৈষম্য রোধে গার্মেন্ট সেক্টরের মতো সরকারি ভাবে নীতিমালা তৈরির দাবি জানিয়েছে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা নারী নেত্রীরা।

এনায়েতপুর থানার তাঁত শিল্প সমৃদ্ধ গোপিনাথপুর গ্রামের দলিত আপুচি বালা (৪৭) গত ৯ বছর আগে অসুস্থ দিনমজুর স্বামী প্রদীপ চন্দ্র সরকারকে হারিয়ে এক সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে নিজেই হাল ধরেছেন। বেছে নিয়েছেন এলাকার সকলের অন্যতম পেশা তাঁত শ্রমিকের কাজ। ভোর থেকে গভীর রাত অবধি নিরন্তর ভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন চরকার হাতল। চরকায় এক পাশে সুতা কেটে ববিনে তোলেন। এভাবে এক ডবল সুতা কাটতে তাকে সুদক্ষ হাতে অন্তত ২ দিন কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। এজন্য ডবল প্রতি তাকে মহাজন মজুরি দিয়ে থাকেন মাত্র ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা। এর মধ্যে সুতার মাড় তৈরিতে চাল কিনে অন্তত ৯০/১০০ টাকা তাকে খরচ করতে হয়। তাতে দিন ৮০/৯০ টাকা হারে মজুরি পেয়ে থাকেন। তাই তিন বেলা আহার জোটানো মুশকিল এই অসহায় নারীর। তিনি জানান, “গাধার মত পরিশ্রম করে যে মজুরি পাই তা দিয়ে খাওয়া চালানোই মুশকিল। তাঁতের শাড়ি কিনে পরবো কীভাবে। এইতো আমাদের সমস্যা। এভাবে কি আমরা চলতে পারি। যে শাড়ি তৈরিতে ভূমিকা পালন করছি, সেই শাড়ি মজুরি দিয়ে কিনতে পারি না। ছেলে তাঁতের কাপড় ভাজের কাজ করে। কোন রকমে ডাল-ভাত খেয়ে চলে হতাশার জীবন। অথচ একই ভাবে পুরুষ শ্রমিক তাঁতে শাড়ি-লুঙ্গি বুনলে দিন ৩শ থেকে ৫/৬শ টাকা মজুরি পান। মহাজনদের বললে তারা মজুরী বাড়াবেনা বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন। তাই কি আর করা উপায় না বুঝে এভাবেই ছোট বেলা থেকেই কাজ করছি আমি।”

মজুরি নিয়ে এমনি আক্ষেপের কথা জানালেন, একই গ্রামের মৃত বৈদ্যনাথ সরকারের স্ত্রী বৃদ্ধা তাঁত শ্রমিক মিনতি বালা (৭৫) এবং গোবিন্দ সিংয়ের স্ত্রী সাজোন্তি সিং (৪০)। তারা জানান, পরিবারের অভাবের কারণে ৭/৮ বছর বয়স থেকে সুতা কাটার কাজ করছি। তখন পেয়েছি ২৫ পয়সা মোড়া (১০টি পোল্লা)। এখন পাই ২ টাকা মোড়া। দিনে বাড়ির কাজের পাশাপাশি ৭/৮ মোটা সুতা কাটলে ২০ থেকে ২৫ টাকা মজুরি পাই। এই দিয়ে কি চলা যায়। তারা আক্ষেপ করে আরো জানান, পুরুষদের ঠিকই ন্যায্য মজুরি দেয়া হয়। আমাদের বেলায় বৈষম্য। কাউকে বলেও লাভ নেই। আর নারীর অধিকার এবং আন্তর্জাতিক নারী দিবস নিয়েও তারা কিছু জানেনা বলে জানালেন।

সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, এনায়েতপুর, শাহাজাদপুর, উল্লাপাড়া, কাজিপুর ও সদর উপজেলার ২০ হাজার তাঁত মালিক তাদের প্রায় ২ লক্ষাধিক ইঞ্জিন এবং হস্তচালিত তাঁতে অন্তত কয়েক লাখ অসহায় নারী শ্রমিক এভাবে কাজ করছেন। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে উৎপাদিত উন্নতমানের শাড়ি-লুঙ্গি দেশের চাহিদা মিটিয়ে ভারত সহ বহিঃর্বিশ্বে রপ্তানি হচ্ছে। এই বস্ত্র তৈরিতে পুরুষরা যেখানে শুধু সুতা রং, শাড়ি বুনন এবং ড্রামে তানা পেচানোর কাজ করলেও নারী শ্রমিকেরা সুতা শুকানো, পাড়ি করা, সুতা কাটা, চড়কা ববিন করা, সেলাই, বুটা কাটার কাজ করছেন। এক্ষেত্রে জেলার তাঁত শ্রমিক নারীরা মূল ভূমিকা পালন করলেও তারা দীর্ঘ দিন ধরে সঠিক মজুরি নিয়ে বিড়ম্বনায় ভুগছেন। পুরুষ শ্রমিকেরও বিষয়টি স্বীকার করলেন অকপটে।

এ ব্যাপারে গোপিনাথপুর গ্রামের তাঁত শ্রমিক রেজাউল করিম, হজরত মোল্লা, গোপালপুরের জামাল মুন্সী, ওমর আলী জানান, আমরা সারাদিন কাজ করলে ৪/৫ শত টাকা মজুরি পাই। আর নারীরা পায় ১শ টাকার উপরে না। তবে নারীদের চেয়ে কিছুটা আমরা ভারী কাজ করে থাকি। সে তুলনায় তাদের অন্তত ২শ টাকার উপরে দিন মজুরি হওয়া উচিৎ।

এ ব্যাপারে খামারগ্রামের জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত টাঙ্গাইল তাঁত বাজার কারখানার মালিক তোফাজ্জল হোসেন বাবুল, গাবতলা গ্রামের তাঁত মালিক হাজী আব্দুল মোন্নাফ, হাজী আতিয়ার রহমান, রুপনাই গ্রামের হাজী বাবুল মিয়া, গোপালপুর গ্রামের আয়নাল হাজী জানান, আমাদের তাঁত শিল্পে মূলত নারীরাই প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে শত বছর ধরে কাজ করে আসছেন। তারা মজুরি কম পান মূলত ভারী কাজ না করার জন্য। তবে সবাই কম পাননা। বেশি কাজ করলে বেশি পান। করোনা আর বাজার মন্দার কারণে বর্তমানে তাদের কিছুটা কম মজুরি দিচ্ছি। আবার বাড়লেই বাড়িয়ে দেয়া হবে।

একই কথা জানালেন সিরাজগঞ্জ হ্যান্ডলুম পাওয়ারলুম ওনার্স এ্যাসোসিয়েশনের সিরাজগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি হাজী বদিউজ্জামান বদি জানান, তাঁত শিল্পে কর্মজীবি নারীদের অবদান বলে শেষ করা যাবে না। তারা যথাযথ মজুরি পাক সেটা আমি চাই। তবে বাজারের বিষয়টিও ভেবে দেখতে হবে। বিদেশে নতুন-নতুন বাজার সৃষ্টি করে এ শিল্পের উৎপাদিত পণ্য বিক্রিতে সরকারের সহায়তা করতে হবে। তবেই বর্তমানে নুয়ে পড়া শিল্প চাঙ্গা হবে। বাড়বে নারী-পুরুষ সব শ্রমিকদের বেতন।

এদিকে নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা আলোচিত নারী নেত্রী এবং বেলকুচি পৌরসভার সাবেক মেয়র বেগম আশানুর বিশ্বাস ও এনজিও কর্মী বিশিষ্ট সমাজ সেবী জুলেখা খাতুন জানিয়েছেন, তাঁত শিল্পে নারীর মজুরি বৈষম্য রোধে গার্মেন্ট সেক্টরের মতো সরকারি ভাবে নীতিমালা তৈরি করা দরকার। তা নেই বলে মূল ভূমিকা পালন করেও নারী তাঁত শ্রমিকেরা সঠিক মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি শ্রমিক ফেডারেশন থাকলে মালিক পক্ষের কাছ থেকে আমাদের অবহেলিত নারীরা দাবী-দাওয়া আদায় করে নিতে পারবে। এক্ষেত্রে অবলা তাঁত শ্রমিক নারীদের ঐক্যবদ্ধ ও দাবী আদায়ে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি।

স্বপন মির্জা- একুশে টেলিভিশনের সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments