জীবন-জীবিকার নিরাপত্মায় স্থানীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চায় ঝালকাঠির দলিত ধাঙ্গর যুবারা

 Posted on


\ পলাশ রায়, ঝালকাঠি \
বাংলাদেশের প্রাচীনতম পৌর সভার একটি হলো ঝালকাঠি পৌরসভা। ১৮৭৫ সালে এ পৌর সভার যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে পৌরসভাটি প্রথম শ্রেণিভুক্ত। পৌর নাগরিকদের পয়:নিস্কাসনসহ পৌরসভার রাস্তাঘাট পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করতে দলিত ধাঙ্গর সম্প্রদায়কে ভারতের দক্ষিণ পরগোনা এবং বিহার রাজ্য থেকে ঝালকাঠিতে আনা হয়। ধাঙ্গররা হরিজন সম্প্রদায় নামেও পরিচিত। বর্তমান ঝালকাঠি শহরের প্রাণ কেন্দ্র জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে গড়ে ওঠে ধাঙ্গরপল্লি। যা লোকমুখে সুইপার কলোনী নামে পরিচিত। সামাজিক বৈষম্য, আবাসন সংকট, বেকারত্ব, শিক্ষায় অনগ্রসরতাসহ নানা সংকট যদিও লেগেই আগে। কিন্তু তার পরও এখানকার যুব সমাজ সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড আর খেলাধূলায় নিজেদের তুলে ধরেছে। স্থানীয় উন্নয়ণে তাদের রয়েছে ইতিবাচক ভাবনা।
এ ব্যপারে কথা হয় এ কলোনীর শিক্ষিত যুবক অজয় ভক্তের সাথে । বরিশাল বিএম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে তিনি অনার্সসহ সমাজকল্যাণে এমএ পাশ করেছেন ৫ বছর আগে। বর্তমানে একটি মোবাইল কোম্পানিতে চাকরি করেন। অজয় বলেন, কোন জনগোষ্ঠিকে পেছনে রেখে সমাজের সামগ্রীক উন্নয়ণ সম্ভব নয়। তবে সামাজিক ভাবে আমরা এই বিশ্বায়ণের যুগেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছি। চাকরিসহ সব ক্ষেত্রেই আমাদের বংশের পরিচয় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তিনি আরও বলেন, অনগ্রসর সম্প্রদায় হিসেবে আমাদের সম্প্রদায়ের জন্য সরকারি ভাবে আলাদা প্রকল্প করে উন্নয়ন মূলক কাজের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের জন্য আলাদা ভাবে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, মোবাইল সার্ভিস, মেয়েদের জন্য পার্লারের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে। আর তা বাস্তবায়িত হলে ধাঙ্গর সম্প্রদায়ে নতুন প্রজন্ম যেমন কর্ম সংস্থান পাবে এবং সামাজিক বৈষম্য দূর হবে। ফলে স্থানীয় উন্নয়নে আমাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, বলেন অজয় ভক্ত। সেই সাথে স্থানীয় উন্নয়নের ব্যপারে তিনি আরও বলেন, ঝালকাঠি জেলাটি নদী ঘেরা। অসংখ্য খাল ও নদী এ জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আরও আছে ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং ভাসমান হাট-বাজার। যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। তাই পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে সাজিয়ে তুলতে পারলে জেলার সামগ্রীক উন্নয়ন সম্ভব। পর্যটন আয় থেকে সরকারি রাজস্বের পাশাপাশি বেকার যুবকদেরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে উল্লেখ করেন ধাঙ্গর যুবক অজয় ভক্ত।


শহরের সুইপার গলিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে করুণ চিত্র। আবাসন সমস্যা তীব্র। নতুন করে একটি দ্বিতীয়তলা বিশিষ্ঠ দালান নির্মাণ হলেও পুরাতন দালানটি ভেঙে পড়েছে। সেখানে চরম ঝুঁকি নিয়ে অনেকগুলো পরিবার বসবাস করছে। একতলা দালানটির ছাদের পলেস্তার খসে পড়ছে। দেওয়াল ভেঙে পড়ার উপক্রম। আর তার মধ্যেই ঠাসাঠাসি করে বসবাস করছেন অসংখ্য পরিবার। বর্তমানে মোট ৩৮টি পরিবার কলোনীতে বসবাস করছেন। এসব পরিবারের ছেলেরা বিয়ে করার পর তাদেরও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বরাদ্দকৃত এক ঘরেই থাকতে হচ্ছে।


এ কলোনীর আরেক যুবক প্রদীপ ভক্ত জানান, ধাঙ্গররা হরিজন ও ডোমসহ কয়েকটি গোত্রে বিভিক্ত। তবে সবাই সনাতন ধর্মাবলম্বী। সূর্য্যপূজা তাদের প্রধান উৎসব। সাংস্কৃতিমনা এ সম্প্রদায় নিজেদের কলোনীতে উৎসব-উপলক্ষ ছাড়াও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ও অনুশীলন করে। তবে সামাজিক কম পায়।
এ প্রসঙ্গে ঝালকাঠি শিল্পকলার তালিকাভূক্ত যন্ত্রশিল্পি (তবলচি) খোকন হরিদন বলেন, আমাদের কলোনীতে অনেক প্রতিভাবান শিল্পি আছেন। যারা বাদ্যযন্ত্র ছাড়াও সংগীত পরিবেশন করতে পারেন। কিন্তু সামাজিক বৈষম্যের কারণে এরা পিছিয়ে পড়েছে। আর অনেক সময় এই বৈষম্যের কারণে অনেকে নিজেদের গুটিয়েও রাখছেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ঝালকাঠির সাংস্কৃতিক অঙ্গন অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। নতুন শিল্পি সৃষ্টি হচ্ছেনা। আর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড কমে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়ছে পেশাদার শিল্পিরা। এ ব্যাপারে সরকারিভাবে সাংস্কৃতিক চর্চায় পৃষ্ঠপোশকতা দিলে জেলার সাংস্কৃতিক উন্নয়ন যেমন ঘটবে সেই সাথে অসংখ্য শিল্পির আয়ের পথও হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক ধাঙ্গর যুবক বলেন, আমাদের কর্মসংস্থানের অভাব সবচে বেশি। অসংখ্য ছেলেরা বেকার। পৌরসভায় যারা সুইপার পদে কাজ করছে তাদের বেতন মাত্র ৪ হাজার টাকা। তার উপর তাদের চাকরি স্থায়ী নয়। যে কোন সময় চাকরিচ্যুত হওয়ার ভয় থাকে। সামগ্রীক উন্নয়নের জন্য সরকারি দপ্তরগুলোতে সুইপারসহ সব পদেই বিশেষ কোটার দাবী করছেন ধাঙ্গর যুব সমাজের।


এব্যাপারে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী বলেন, ক্লিনার পদে এ সম্প্রদায়কে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। নানারকম কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের জীবন-মানের উন্নয়নের ব্যপারে চেষ্টা চলছে।

Facebook Comments