জীবনযুদ্ধে হার না মানা শিখারানী ও দুর্গা দাস

 Posted on

মিঠুন দাস, খুলনা : জীবন যুদ্ধে হাল না ছাড়া স্বামী হারা নারী দুর্গা দাস (৫৮)। বাড়ী খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্নিয়া গ্রামে। ইটের ভাটায় কাজ করে জীবন চালাচ্ছেন। মাথার উপর প্রখর রোদ উপেক্ষা করে ইট ভাটায় ইটের চুল্লির ভিতরে ও বাইরে ইটের খারিতে মাটির প্রলেপ লাগানোসহ ইট তৈরির কাজ করেন। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে সন্ধ্যায় কাজ শেষে পারিশ্রমিক নিয়ে বাজার করে বাড়ী ফেরেন তিনি। এই ভাবেই সংসারের টানাপোড়েনে জর্জরিত দুর্গা দাস। প্রায় ৬ বছর যাবত তিনি কাজ করছেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্নিয়া মেসার্স নূর জাহান ব্রিকস নামে ইট ভাটায়। ইট ভাটায় গিয়ে দেখা যায় দুর্গা দাস ও শিখা দাস (৩৫) ইটের খারিতে প্রলেপ দিচ্ছেন। বর্তমান জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্গা দাস জানান, ৬ বছর পূর্বে তার স্বামী মারা যান। তিন মেয়েকে বিবাহ দিয়েছেন অনেক কষ্টে। ছোট মেয়ে জামাইসহ ১ নাতনি নিয়ে তার সংসার। ছোট জামাই খুব অসুস্থ। তাই এই বয়সে অনেক পরিশ্রম করতে হচ্ছে। তিনি তা রোজগার করে তা দিয়ে কোনো মতে সংসার চালিয়ে নাতনিকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, “আমার পারিবারিক অবস্থা খুবই খারাপ, বয়সের কারণে আগের মতো ভারী কাজ করতে পারি না। তাই প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা রাত পর্যন্ত ইট ভাটায় মাটি টানা, ইটের ভাঙ্গা অংশ সরানো সহ নানা কাজ করে তিন’শ টাকা পাই। তা দিয়ে কোনো মতে সংসার চলছে। ক্লান্তিহীন পরিশ্রম তার উপর দিনভর ধুলো বালির মধ্যে কাজ করতে হয়। প্রতি মাসে লেগে থাকে অসুখ বিসুখ। সংসার কোনো মতে চললেও অসুখ বিসুখের ঔষধের টাকার জন্য অন্যের কাছ থেকে কিংবা ইট ভাটার মালিকের কাজ থেকে অগ্রীম টাকা নিতে হয়।”

দারিদ্র্যের কারণে পুষ্টিকর খাবার মেলে না দুর্গার।

একই অবস্থা তার সাথে কাজ করতে আসা শিখা রানীর। খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্নিয়া ইউনিয়নের রানাই গ্রামে তিনি বসবাস করেন। ২ ছেলে ও ১ মেয়েকে নিয়ে শিখা রানীর সংসার। অসুস্থ স্বামী আগের মতো খাটা-খাটনি করতে পারেন না। সংসার চালাতে শিখা রানীর হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয়। শিখা রানীর স্বামী কৃষ্ণ দাস অসুস্থ থাকার পরেও মাঝে মাঝে ইটের ভাটায় কাজ করে সংসার চালায়। বর্তমান জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে শিখা রানী দাস বলেন, “আমার ২ সন্তানকে অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া শিখাচ্ছি। বড় ছেলে সুদেব পারিবারিক অভাব অনটনের জন্য লেখাপড়া করতে পারেনি। বর্তমানে সুদেব খুলনা শহরে রিকশা চালায়। দিন শেষে যা রোজগার করে তাই দিয়ে ওর বাবার ওষুধ কেনাসহ ছোট ভাই বোনের লেখাপড়ার খরচ বহন করে।”
শিখা রানীর ছোট ছেলে সহদেব দাস ১০ম শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে স্মৃতি দাস খর্নিয়া ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী।

একই গ্রামের খুকু দাসী (৪২) তার জীবন সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে বলেন, “আমরা যে কাজ করি তার যথাযথ মূল্যায়ন পাই না। আমাদের এলাকায় আমরা নারীরা ধান রোপন, ধান কাটা এবং পরিস্কার করা থেকে শুরু করে কৃষি জমির সব ধরনের কাজ করি। কিন্তু যথাযথ পারিশ্রমিক পাই না। আমরা নারী পুরুষ একসঙ্গে কাজ করলেও মজুরীর ক্ষেত্রে পুরুষরা বেশি টাকা পায় আমরা কম টাকা পাই।” খুকু দাসী আরো বলেন, “আমার ২ ছেলে ও ১ মেয়েকে নিয়ে কোনো মতে দিন চলছে। পরিবারের ভরণপোষণসহ ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচের জন্য আমাকে কৃষিকাজ করতে হয়। আমি প্রতিদিন যা রোজগার করি তা দিয়ে সংসার চলে না। আমার সংসার চালানো খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এই জন্য আমার ছোট ছেলে সেলুনের কাজ করে।”

নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার দৌঁড়ে অনেক নারীরা এগিয়ে থাকলেও গ্রামের দলিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীরা পিছিয়ে রয়েছে। গ্রামের দলিত নারীরা গৃহ শ্রম, কৃষি, শিল্প খাতে কাজ করলেও তারা প্রত্যাশিত মর্যাদা ও স্বীকৃতি থেকে এখনো বঞ্চিত। অর্থনৈতিতে তাদের বড় ভ‚মিকা থাকলেও তাদের অবদান স্বীকৃত নয়। গ্রামের দলিত নারীদের শ্রম মর্যাদা এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না করা গেলে তাদের জীবন মান উন্নত হবে না।

মিঠুন দাস, তৃণমূল সংবাদকর্মী, বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments