চারুবালা বাড়ৈ-বিভারানী সাহা’র জীবন সংগ্রাম আর শত্রু সম্পত্তি আইন

 Posted on

মশিউর রহমান টিপু, পটুয়াখালী, :: চারুবালা বাড়ৈ। বাসা পটুয়াখালী শহরের পুরান বাজার এলাকায়। তার স্বামী অমিত কুমার বাড়ৈ। যিনি ৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে দেশকে করেছিলেন স্বাধীন। একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা হিসাবে দেশকে হানাদার মুক্ত করলেও নিজ ভিটামাটি তিনি রক্ষা করতে পারেননি। ১৯৭৬ সালে পুরান বাজার এলাকায় বসত বাড়িসহ তাদের ৫২ শতাংশ জমি শত্রু সম্পত্তি হিসাবে তালিকাভুক্ত হয়। সে সময় তাদের বাড়ির ভাড়াটিয়া মোমতাজ বিহারী অমিত কুমার বারুই মারতে চাইলে সে দেখিখে ভূমি অফিসের কর্মচারীদের যোগসাজসে গোপনে অমিত বারুই ভারতে চলে গেছেন দেখিয়ে তাদের সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি করান এবং জেলা প্রশাসক কাযালয় থেকে গোপনে লিজ নিয়ে নেন। এর এক পর্যায় তারা ভুয়া দলিল দেখিয়ে সে সম্পত্তি তাদের বলে দাবী করেন। অমিত বাড়ৈই স্ত্রী চারুলতা বাড়ৈই বলেন, আমরা যখন জানতে পারি তখন আমার স্বামী কোর্টে মামলা দায়ের করেন। আমার স্বামী অমিত বারুই এ্যাডভোকেট হিসাবে নিজেই মামলা পরিচালনা করতেন। মামলা চলাকালীন সময়ে কোর্ট এলাকায় একদিন জমির দলিলপত্র সহ মূল কাগজপত্র তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় ছিড়ে ফেলেন। তার প্রভাবশালী হবার কারনে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায়নি। একজন মুক্তিযোদ্ধা ও আইনজীবী হওয়া সত্বেও তিনি তার ভিটে মাটি রক্ষ করতে পারেননি। এই ঘটনায় তিনি ভীষন ভাবে আঘাত পান। এ ঘটনার কিছুদিন পর হার্টএ্যাটাকে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। এরপরে তার স্ত্রী চারুবালা বাড়ৈই আর পরিবারে উপর নানা ভাবে অত্যাচার চলে, যাতে তারা তাদের ভিটে মাটি থেকে চলে যান। চারুবালা বাড়ৈই বলেন- আমি যে ঘরে থাকি তার পাশেই ইচ্ছে করে তাদের কাঁচা চামড়া রাখার গুদাম করা হয়েছে, এর গন্ধে ঘরে টেকা যায় না। আমার ঘরের সামনে গরুর রক্ত আমার ঘরে ছিটিয়ে দেয়াসহ নানাভাবে অত্যাচার চালানো হচ্ছে। আমাদের বাড়ীর ভিতর নিজেদের বানানো যে সব ঘরের ভাড়া নিয়া সংসার চালাতাম, সে সব ঘরও দখল করে নেয়া হয়েছে। এসব দখলদার মধ্যে আছেন- আওয়ামীলীগ নেতা আঃ মান্নান, গোলাম সরোয়ার, পৌর কমিশনার বাসুদেব কুন্ডু, আঃ রাজ্জাক, আনোয়ার হোসেন হাবিবুর রহমান, সুনিল সাহা, অনিল দাস, গোবিন্দ সাহা। আওয়ামী লীগের এই দুই নেতা ও পৌর কমিশনার মিলে টাকার বিনিময়ে আমাদের জমি এসব ব্যক্তিদের দখল দিয়ে দেয়। তাদের কেউ কেউ এখানে ঘর করছে। যদিও মামলা চলমান ছিল।
চারু বালা বাড়ৈ জানান অর্পিত সম্পতি প্রর্ত্যাপন আইন হলে সে আইনে আমরা ট্রাইব্যুনালে মামলা করি। এ বছরের ২০ মার্চ অর্পিত সম্পত্তি প্রর্ত্যাপন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জিন্নাৎ জাহান ঝুনু আমাদের পক্ষে রায় প্রদান করেন। পরবর্তীতে অপর পক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। আপিল এখনও চলমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমি যতদিন জীবিত আছি ততদিন আমাদের স্বামীর বিরুদ্ধে আইনি চালিয়ে জমির দখল নিয়েছে চেষ্টা চালিয়ে যাব। আমার মৃত্যুর পর কি হবে জানি না করেন, আমার ছেলে সন্তান নেই। দুই মেয়ে আছে তাও পটুয়াখালীতে থাকেন না।
বিভা রানী সাহা ঃ শত্রু সম্পত্তি আইনে পূর্ব পুরুষের ভিটা মাটি হারিয়ে ফিরে পাবার জন্য আজো সংগ্রাম করছে পটুয়াখালী শহরের চক বাজার এলাকার আরেকজন নারী। তার নাম বিভারানী সাহা। বাবার নাম- মধু সুধন সাহা। বিভা রানী সাহা জানান, স্বাধীনতার পরে তাদের বাসার সামনের একাংশ আঃ আজিজ নামে এক ব্যক্তিকে ভাড়া দেন তার বাবা। সেখানে তারা কাপড়ের দোকান দেয়। তারা নিয়মিত মাসিক ভাড়ার টাকা দিয়ে আসছিল। তারই মধ্যে আমরা বাংলাদেশে নাই, ভারতে চলে গেছি, এ রকম ভুয়া কাগজপত্র জমা দিয়ে ১৯৭৭ সালের ২১ মার্চ আমাদের বাড়ি শত্রু সম্পত্তি হিসাবে তালিকাভুক্ত করায় এবং তাদের নামে লিজ নিয়ে নেয়। আমার বাবা ব্যবসায়ী মানুষ ছিলেন তত কিছু বুঝতো না। আমি তখন ঢাকায় বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশুনা করছি। আমার দুই ভাই ছিল অজিত সাহা ও রণজিত সাহা তারাও এখানে ব্যবসা করতো। এক সময় আমাদের ভাড়াটিয়া আঃ আজিজ আমাদের দোকান ঘর সহ বাড়ির একাংশ দখল করে নেয়। আমার ভাইয়েরা প্রতিবাদ করলে তাদের নামে বিভিন্ন মিথ্যা মামলার জড়ানো হয়। এছাড়া নানাভাবে আমাদের হয়রানী করে। এসব কারনে আমরা দুই ভাই এক সময় দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ভারতে চলে যান। আমাকে তখন বাবা ঢাকা থেকে পটুয়াখালী নিয়ে আসেন। আমি বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশুনা করলেও আমার পূর্ব পুরুষদের ভিটা মাটি রক্ষার জন্য আইনে পড়াশুনা শুরু করি এবং এ্যাডভোকেট হয়ে নিজেই মামলা পরিচালনা শুরু করি। সেই সে শুরু করেছি তা আজো শেষ হয়নি। আমাদের জমির দখলদার আঃ আজিজের মৃত্যু হলে তার ছেলে ফজলুল হক এখন আমাদের জমি দখল করে আছে। তারা জমি বিক্রীর একটি ভুয়া দলিল দেখিয়েও কোর্টে মামলা করে আমাদের উচ্ছেদ করতে চেয়েছে কিন্তু সফল হয়নি। তারা সেই সময় থেকে এখনও আমাদের উপর অন্যায় অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। পৌরসভা দিয়ে আমাদের টয়লেট ভেঙ্গে দিয়েছে। তার একটাই উদ্দেশ্য যাতে আমরা এখান থেকে চলে যাই। কিন্তু তারা সফল হয়নি। আমরা অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পন আইনে মামলা করেছি। সে মামলায় আমরা রায় পেয়েছি। কিন্তু তারা জমির দখল এখনও ছাড়েনি। এখন ট্রাইব্যুানাল আপিল চলছে।
সময় বদলেছে, বদলেছে ভূগোল, বদলায়নি দলিত ও সংখ্যালঘুদের ভাগ্য। এ ভাবেই চারুবালা বাড়ৈই আর বিভা রানী সাহাদের অনেকেই নিস্পেষিত হচ্ছেন শত্রু সম্পত্তি আইনে। খাস জমি বিষয়ক সরকারী আইনজীবী (এজিপি) এ্যাড. বিভা রানী সাহা জানান, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পন আইন হবার পরে পটুয়াখালী ট্রাইব্যুনালে ১ হাজার ৭০০ মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনালের হয়েছে প্রায় ১০০টি মামলা। ৩০টি মামলার আপিল শুনানী চলছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারন সম্পাদক উত্তম কুমার দাস বলেন- দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ২০০১ সালে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পন আইন পাশ হওয়ার মধ্য দিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে যে আশার সঞ্চয় হয়েছিল তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় নিরাশায় পরিনত হয়। বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নির্যাতনের এই ঘড়গটাকে অপসারন করার জন্য এই আইনটি পাশ হয়। পরবর্তীতে ২০১১ সালে শক্র সম্পত্তি প্রত্যার্পন আইনটি বাস্তবায়নের সরকারের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে দীর্ঘদিনের এই সমস্য সমাধান কল্পে বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা দেয়া সত্বেও মাঠ পর্যায়ে কার্যকরী কোন ব্যবস্থা গ্রহন না করায় ভুক্তভোগীরা কোন সুফল পাচ্ছে না। যদিও ট্রাইবুনালে মামলা দায়ের এক যুগ পাড় হওয়া সত্বেও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে না। উদাহরন স্বরূপ বলা যায়, মহান মুক্তিযুদ্ধের রনাঙ্গনের একজন বীর সৈনিক এ্যাডভোকেট অমিত কুমার বাড়ৈই তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলার ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ভূখন্ডকে জীবনবাজী রেখে শত্রুমুক্ত করেছেন। কি নির্মম পরিহাস সেই রণাঙ্গণের সৈনিক এ্যাডভোকেট অমিত কুমার বাড়ৈই’র পটুয়াখালী শহরের পুরান বাজার এলাকায় নিজ ভূমিও স্বাধীনতা বিরোধীদের যোগসাজসে শত্রু সম্পত্তিতে পরিনত হয়। এই শত্রু সম্পত্তি রক্ষার লক্ষ্যে যে ব্যক্তিটি ১৯৭১ সালে দেশকে রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে শত্রু মুক্ত করেছিল। শত্রুমুক্ত দেশে নিজ রাজভূমি রক্ষার জন্য আইনের মাধ্যমে যুদ্ধ করতে করতে ২০১১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। হতাশার মধ্য দিয়েও আমরা আশাবাদী হতে চাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অর্পিত সম্পত্তি আইনের সুফল ভুক্তভোগীরা পাবে।

মশিউর রহমান টিপু, দৈনিক খোলাকাগজ, পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি এবং  শারি’র মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের কোষাধ্যক্ষ

Facebook Comments