খুলনায় কুটির শিল্প ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রসার ঘটানোর চেষ্টা করছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠি

 Posted on

মিঠুন দাস, খুলনা :: কুটির শিল্প বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী একটি শিল্প। এই শিল্পে বাংলার আবহমান সংস্কৃতির প্রতিভাস ফুটে ওঠে, যার নির্মাতা পল্লী অঞ্চলের মানুষ। যাদের জীবিকা এবং নিজস্বতা ব্যবহারের জন্য তারা এ সকল পণ্য উৎপাদন করে। বাংলার প্রকৃতি, মানুষ, পশুপাখি, লতাপাতা, গাছপালা নদ-নদী ও আকাশ, কুটির শিল্পের ডিজাইনে বা মোটিভে দেখা যায়। কুটির শিল্পকে অনেকে হস্তশিল্প, কারুশিল্প, সৌখিন, শিল্পকর্ম, গ্রামীণ শিল্প বলে। বর্তমানে খুলনাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠির কারিগররা তাদের কারুকার্য খচিত হস্তশিল্পের প্রসার ঘটানোর চেষ্টা করছে। খুলনায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠির কারিগরগুলো বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ, বেতঝোপ থেকে বেত কেটে এনে হাতের গুণে তৈরি করে নানা প্রকার ব্যবহারযোগ্য জিনিস। বেতের ডালিয়া, চাটাই, মাছ ধরার ফাঁদ, ঘরের বেড়া, মোড়া, ঝুড়ি, ধান-চালের বেড় ও সরিষার আকার ছোট-বড় ডুলি, বেতের ধামা, ডালি, ডুলি, টুকরি, ঝাকা, কুলা, চালনি, খালই প্রভৃতি তৈরি করে চলছে তাদের জীবন জীবিকা।

কালিপদ দাস একজন কুটির শিল্পী । তিনি বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই বাঁশ-বেতের কাজ করি। ছোটবেলায় অভাবের তাড়নায় লেখাপড়া করতে পারিনি। আজ থেকে প্রায় ২৭ বছর আগে আমি আমার বাবার হাত ধরে এই পেশায় এসেছি। বর্তমানে আমি বাঁশ, বেত দিয়ে বিভিন্ন পণ্য-সামগ্রী যেমন, ঝুড়ি, ডালা, কুলা, ডারি, মাছের টোপ, খালই, খাচা, ধামা, ঘরের বেড়া, ডোল, চাটাই, কৃষকদের টোপরি সহ ইত্যাদি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করি। যা উপার্জন করি তা দিয়ে ছেলেমেয়ের লেখাপড়াসহ পরিবারের ভরন-পোষণ চালাই। সংসারের আয়-রোজগারে এটাই আমার প্রধান পেশা। তিনি আরও বলেন, আমাদের খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ঋষি পল্লীতে দাস সম্প্রদায়ের প্রায় ২৫৫ টি পরিবার রয়েছে। এখানে হাতে-গোনা ৩৫-৪০ টি পরিবার বাঁশ, বেতের কাজ করে। এ সমস্ত পরিবারের ঘরের আনাচে-কানাচে বাঁশ, বেতের তৈরি জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। বাড়ির মধ্যে বসে বাঁশ, বেত হতে ধারালো দা, বটি দিয়ে নিপুন হাতে কেউ কেউ বাঁশের বেতি বা চটা দিয়ে তৈরি করছে চাটাই, ডোল, ঝুড়ি, ডালা, কুলা, টোপরিসহ বিভিন্ন কৃষি ও গৃহস্থলী জিনিসপত্র। এদের মধ্যে কেউ কেউ নতুন জুতো তৈরি করে তা বাজারে বিক্রি করে। এখন তাদের মধ্যে দুই এক জন অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়লেও তাদের পরিবারের মহিলারা গৃহস্থলীর কাজের পাশাপাশি বাঁশ, বেতের জিনিসপত্র তৈরি করে থাকেন এবং তা বাজারে বিক্রি করে তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন। কারিগর বিকাশ দাস (৩৮) জানান, তার বাপ-দাদারা বাঁশ-বেতের কাজ করতেন। এখন তারা দুই ভাইয়ের সংসারে এ কাজ করে জীবিকা আসছে। তিনি বলেন, আমি ছোটবেলা থেকে লেখাপড়ার পাশাপাশি অবসর সময় পরিবারের বাবার সাথে বাঁশ-বেতের কাজ করতাম। আমি এসএসসি পাশ করেও বাড়িতে বেকার হয়ে বসে না থেকে বরং পরিবারের পেশাটা ধরে বেঁচে আছি। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে প্লাস্টিক ও এ্যালুমিনিয়ামের গৃহস্থলীর জিনিসপত্র দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলনের কারণে আমাদের তৈরিকৃত জিনিসপত্রে একটু ভাটা পড়েছে।
আমাদের উৎপাদিত পণ্যের যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রদর্শণী করা হয় তাহলে আমরা উপকৃত হবো। আমাদের হাতে তৈরি পণ্য সামগ্রী সম্পর্কে দেশের সকলে জানতে পারবে এবং সেইসাথে আমাদের হাতে তৈরি পণ্য-সামগ্রীগুলোর চাহিদা বেড়ে যাবে। বাঁশ, বেত দিয়ে তৈরি পণ্য সামগ্রীর উৎপাদনও বাড়বে।
নিখিল চন্দ্র দাস জানান, খুলনায় অধিকাংশ বাঁশ, বেতের তৈরি পণ্যের কারিগররা দরিদ্র হওয়ার কারণে এই পেশা কয়েক বছরের মধ্যে হারাতে বসবে। বর্তমানে বাঁশ, বেতের দাম যে হারে বেড়েছে তাতে করে দরিদ্র কারিগরগুলো ঠিকমত পণ্য-সামগ্রী তৈরি করতে পারছে না। এ সমস্ত দরিদ্র কারিগরদের যদি পণ্য তৈরিতে সহজশর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে এ কারিগররা স্বাবলম্বী হবে। এবং পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত হবে। নিখিল দাস আরো বলেন, আমাদের উৎপাদিত পণ্য তৈরিতে উৎপাদনে যে খরচ হয় আমরা পণ্যগুলোর বিক্রিতে ন্যায্যমূল্য পেয়ে থাকি।

বাঙালি সাংস্কৃতি বলতে সাধারনত বোঝানো হয় বিশেষ সমাজে সাহিত্য, সংগীত, ললিত কলা, ক্রীড়া, মানবিকতা, জ্ঞানের উৎকর্ষ ও আরো অনেক শান্তি ও সৌন্দর্যের সমারোহ। এরপরও ব্যাপক দৃষ্টিতে দেখলে সংস্কৃতি হলো মানুষের জ্ঞান, আচার-আচরণ, বিশ্বাস, রীতিনীতি, নীতিবোধ, চিরাচরিত প্রথা, সমষ্টিগত মনোভাব, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং অর্জিত কৃতিসমূহ, নৃতাত্তি¡ক দিক দিয়ে সংস্কৃতি আবার ভিন্ন ধরনের একটি জটিল ধারণা। যেহেতু সব সংস্কৃতিই উৎস বিকাশ, মূল্যবোধ এবং সংগঠনের দিক দিয়ে বিশিষ্ট। তাই বাহ্যিক রুপ-রেখা তার বিবিধ প্রকাশ। এবং নির্যাসে এক সংস্কৃতি অন্য সংস্কৃতি থেকে পৃথক। হাজার বছর ধরে নানা নৃতাত্তি¡ক এবং ধর্মীয় জনগোষ্ঠি ও শাখাগোষ্ঠি নানা শ্রেণীর মিলন, পারস্পরিক প্রভাব এবং সমন্বয়ের ফলে গড়ে উঠেছে বঙ্গীয় সংস্কৃতি। এই বাঙালি সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে গেলে বাঙালির সকল উৎসবে দলিতদের অংশগ্রহন করতে হবে। দলিতদের নিজস্ব সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে দলিতদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে দলিতদের সংস্কৃতি টিকে থাকবে।

মিঠুন দাস, সংবাদকর্মী খুলনা এবং শারি’র মাইনোরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments