খুলনার বাঙালী উৎসব-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি

 Posted on


মিঠুন দাস,খুলনা : গ্রামই বাংলাদেশের জনজীবনে লোকসংস্কৃতির প্রাণকোষ। গ্রামেই অধিকাংশ লোক বাস করে। তাই লোকসংস্কৃতি ও লোকজীবন নিয়ে পর্যালোচনা করতে হলে গ্রামকে অবশ্যই মূল্য দিতে হবে। আমাদের দেশে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোক আছে। এর মধ্যে কৃষিকাজে জড়িত লোকের সংখ্যা বেশি। কৃষিজীবী মানুষের পাশাপাশি অন্যান্য পেশাজীবীদের মধ্যে আছে মাঝি-মাল্লা, জেলে, তাঁতী, কামার, কুমার, ছুতার, সেকরা, কাসারী, চুনারী, তেলি, মালী, ধোপা, গোয়ালা, ময়রা, কাহার, ঘরামী, কাঠুরে, বারুই, বেদে, দর্জি, কবিরাজ, ওঝা, কসাই, নাপিত, ডোম, চর্মকারসহ আরো অনেক পেশাজীবি মানুষ। খুলনা জেলার পেশাভিত্তিক লোকজ সংস্কৃতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পালকির গান, ওঝার গান, বাওয়ালীদের গান,গাছ কাটার গান, গাড়োয়ানের গান, জেলেদের গান, কবিরাজের গান, ঘোল তৈরির গান, চুন তৈরির গান, কুমারের গান, হাবু গান, ধান কাটার গান,ধুয়া গান ইত্যাদি। এছাড়া আছে তালের পাখা, শোলার খেলনা,বাঁশ ও বেতের পাত্র, মাটির পাত্র, পুতুল ও খেলনা, মাদুর, কাঠের খেলনা ইত্যাদি তৈরি কাজে নিয়োজিত পেশার মানুষের দ্বারা গড়ে ওঠে লোকজ সংস্কৃতি। প্রাচীনকাল থেকে গ্রাম বাংলায় পালকির প্রচলন ছিল। পালকির ব্যবহার সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে ছিল। জমিদারদের আট বেহারা, ষোলো বেহারার পালকি এখন অতীত হয়ে গেছে। কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে একসময় পালকিই ছিল অন্যতম প্রধান বাহন। বিয়ে-সাদীতে পালকি না হলে বিয়ের আমেজই পাওয়া যেত না। খুলনা জেলার উত্তরাঞ্চলে একসময় প্রচুর খেজুর ও তালগাছ ছিল। শীতকালে তাল ও খেজুর গাছ কেটে রস বের করে গুড় বানাতো গাছিরা। বর্তমানে ইটভাটা ও পাঁজাগুলোতে পোড়ানো হয় খেজুরের গাছ। ফলে গাছের অস্তিত্ব বিলুপ্তির পথে। খেজুরের খাটি রস এখন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। খুলনা জেলায় বিভিন্ন এলাকায় একসময় গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল। খুলনাতে অনেক গ্রামে ঘোষদের বসবাস ছিল। তারা দধি, ঘোল ও ঘি এবং ছানা তৈরি করে গ্রামে বিক্রি করে বেড়াতো। এ জেলাতে একসময় অনেক চুন তৈরি পেশার মানুষ ছিল। তাদেরকে চুনারী বলা হত। তারা নদী নালা ও খাল বিল থেকে শামুক,ঝিনুক সংগ্রহ করে তা আগুনে পুড়িয়ে চুন তৈরি করত। খুলনা জেলায় বিভিন্ন কুমারদের বসবাস আছে। বাঙালী হিন্দুদের একটি বড় উৎসব শ্রী শ্রী শারদীয় দূর্গাপূজা। এই দূর্গাপূজা হিন্দুদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটা বড় চর্চা। বাঙালী হিন্দুদের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে খুলনাতে বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবারের ন্যায় এবারও দূর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। হিন্দুধর্মের সংস্কৃতিকে নিশ্চিন্ন করার জন্য খুলনা খালিশপুর ক্রিসেন্ট জুট মিলের মন্দিরে দূর্গা প্রতিমা ভাংচুর এর অভিযোগ পাওয়া যায় গত ৫ই অক্টোবর ২০১৮ শুক্রবার। ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে দেবব্রত বাইন (৪৫) বলেন, আমাদের দি ক্রিসেন্ট জুট মিলস্ পূজা মন্দিরসহ আমাদের রজনীগন্ধা কলোনিতে প্রায় ২৫০ ঘর হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস। আমরা বিগত ৪০ বৎসর যাবত এখানে আমাদের হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার জন্য এই মন্দিরে পূর্জা পার্বন করে আসছি। দিরেন্দ্রনাথ রায় (৪৮) বলেন, আমাদের এখানে কালী পূজা, দূর্গাপূজা, ল²ীপূজা, সরস্বতী পূজা ও অন্যান্য দেব-দেবীর পূজা করা হয়। বর্তমানে আমাদের হিন্দু ধর্মীয় কৃষ্টি  ও সংস্কৃতি নিশ্চিন্ন করার জন্য কিছু উগ্রমৌলবাদিরা আমাদের মন্দিরে হামলা করে রাতের আঁধারে প্রতিমা ভাঙচুর করে। এভাবে যদি আমাদের হিন্দুদের উপর বিভিন্ন পূজার সময় উগ্রমৌলবাদিরা প্রতিমা ভাঙচুর করে তাহলে দেখা যাবে এক সময় আমাদের হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। চৈত্রসংক্রান্তি একসময় গ্রামীণ জনপদের প্রধান উৎসব ছিল। চৈত্রসংক্রান্তির প্রধান উৎসব চড়ক পূজা। চড়ক গাজন উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ খুলনা জেলার বিভিন্ন হিন্দু প্রধান এলাকাতে। চৈত্রসংক্রান্তি রাতে শিব-গৌরীর নাচ ও লোকাচারসহ পূজা অর্চনা করা হয় এলাকার বাড়িতে বাড়িতে। পিঠা উৎসব মানে বাঙালীর পুরানো ঐতিহ্য। হাজার বছরের পুরানো সংস্কৃতি। খুলনাতে একসময়ে সমস্ত গ্রাম্যপ্রধান এলাকাতে পিঠা তৈরির জন্য গ্রাম বাংলার তরুণী, নববধূ,কৃষাণিদের কণ্ঠে বিভিন্ন রকম গান শোনা যেত। অগ্রহায়ন-পৌষ মাসে কৃষক ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে কৃষাণিদের ঘরে ধান থেকে নতুন চাল গুড়া করার ধুম পড়ে যেত। আর সেই চাল দিয়ে পিঠাপুলি,ফিরনী, পায়েস তৈরি করা হত। এছাড়াও নবান্ন উৎসব, বিয়ে,ঈদ,পূজাতে ঢেঁকিতে ধান ভেনে আটা তৈরির সময় গ্রাম্য বধূরা গান গাইতো।

মিঠুন দাস, সংবাদকর্মী এবং শারি’র মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের কোষাধ্যক্ষ

Facebook Comments