কোচিং ও প্রাইভেট নির্ভর লেখাপড়া : অর্থ সংকটের কারণে বাগেরহাটের দলিত সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েরা প্রাথমিকের পর আর এগুতে পারছেনা

 Posted on

আজাদুল হক, বাগেরহাট :: একাডেমিক শিক্ষা-প্রাইভেট ও কোচিং নির্ভর হয়ে পড়ায় সারা দেশের মতো বাগেরহাটের দলিত সম্প্রদায়ও লেখাপড়ায় এগুতে পারছে না। কারণ দলিত সম্প্রদায়ের মানুষরা দরিদ্র। আর লেখাপড়া ব্যয়বহুল হয়ে পড়ায় প্রাথমিকের পর এ স¤প্রদায়ের অধিকাংশ ছেলে-মেয়েরা মাধ্যমিকে পড়তে পারছে না। ব্যতিক্রম ২/৪জন ছাড়া বাকি ছেলে-মেয়েরা পরিবারের আয়-রোজগারে জড়িয়ে পড়ছে। বাগেরহাটের যাত্রাপুর লাউপালা, শহরের মুনিগঞ্জ চাঁনমারী ঋষিপাড়া, পুরাতন রেল স্টেশনের হরিজন বস্তি, লিচুতলা ডোম পাড়া এলাকায় বসবাসকারী দলিত স¤প্রদায়ের নারী ও পুরুষের সাথে তাদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার বিষয়ে কথা বললে তারা বলেন, “টাকা-পয়সা ছাড়া ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শিখানো কষ্টসাধ্য। তাই প্রাইমারি স্কুলে পড়া শেষ হলে আর বেশি লেখাপড়া করানো যায় না।” দিপু রবিদাস বলেন, “সাংসারিক খরচের পর বাড়তি টাকা আয় না থাকলে ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়া করানো সম্ভব নয়, আমরা নীচু জাতের মানুষ, চামারের কাজ করে জীবিকা চালাই, আমাদের কথা কেউ শুনতে চায় না। সাহেবরা শুধু জুতা ব্যাগ সারাতে আমাদের কাছে আসে, কাজ শেষে মজুরি দিয়ে চলে যায়। ভালমন্দ আর কোন কথা বলে না, তবে কাজে ত্রæটি হলে গালমন্দ করতে ছাড়ে না। ইচ্ছা ও স্বপ্ন থাকলেও আর্থিক দৈন্যতার কারণে ছেলে-মেয়েকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে লেখাপড়া শিখাতে পারি না।” দলিত বা হরিজনদের জন্য বিনা খরচায় কোন সুযোগ-সুবিধা থাকলে সেখানে হয়ত ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করতে পারত বলে বাগেরহাট শহর রক্ষা বাঁধে বসবাসরত ঋষি সম্প্রদায়ের সদস্যরা এ কথা বলেন। দিপু রবিদাস দলিত কন্ঠের এ প্রতিবেদককে কাছে পেয়ে অবেগে আপ্লুত হয়ে তার মনের কথা বলেন। “স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে নিয়ে ৬ সদস্যের সংসার তার। একা প্রতিদিন যে রোজগার করি তা দিয়ে সংসারিক খরচ চালানো খুবই কষ্টসাধ্য। বড় মেয়েটা সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে আর স্কুলে যায়না। প্রাইভেট পড়তে চায় সে টাকা কোথায় পাব। ভাল জামা কাপড় নাই। তাই পিতা হয়েও মেয়েকে বড় স্কুলে পাঠাতে ব্যর্থ।” ওই বাড়িতেই কথা হয় লক্ষ্মী রানী রবিদাস নামের এক দলিত গৃহবধূর সাথে। তিনি বলেন, “শুনেছি মেয়েদের লেখাপড়ায় কোন টাকা খরচ হয় না। কিন্তু আমাদের মেয়েদের জন্য কোন সহায়তা পাই না। স্কুলে যাওয়ার পাশাপাশি মাস্টারদের কাছে আলাদা পড়তে হয়। অন্যথায় পরীক্ষায় ভালো ফল হয় না। এ কারণে আমাদের মেয়েরা স্কুলে যেতে চায় না।” বাগেরহাটে দলিত স¤প্রদায়ের মানবাধিকার বিষয়ে একটি সেমিনার শেষে সুবাস হাওলাদার একান্ত আলাপচারিতায় এ প্রতিবেদককে বলেন, “ছোট বেলায় দলিত পরিবারের সদস্য হিসেবে সাধারণ মানুষদের সাথে চলাফেরা করতে অনেক বাধা-বিপত্তি হয়েছে। রক্ষণশীল পরিবারের মানুষরা হরিজন হিসেবে তাদের ঘৃণা করত। এখন সমাজ ব্যবস্থা কিছুটা পাল্টে গেছে। তাই সমাজের সব শ্রেণির মানুষের সাথে চলাফেরা করতে তেমন একটা সমস্যা হয় না। তবে, আর্থিক সমস্যায় কেউ এগিয়ে আসে না।” সুবাসের ছেলে ও মেয়েকে লেখাপড়া শেখানোর আগ্রহ দেখে খুলনা খ্রিস্টান সার্ভিস সোসাইটি নামের একটি সংস্থা তাদের অর্থায়নে ছেলে চয়ন হাওলাদারকে খুলনার একটি কিন্ডার গার্টেনে ভর্র্তি করে দিয়েছে। এখন চয়ন ওই কিন্ডার গার্টেনে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। আর মেয়ে চৈতিকে বাগেরহাট শহরের একটি কেজি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। সুবাসের স্ত্রী বুলি রানী বলেন, ছেলের একটা পথ হয়েছে, আর মেয়ে চৈতিকে প্রতিদিন একটি শিশু স্কুলে আনা নেয়া করছি। ওর ভবিষ্যত কি হবে জানি না। বাগেরহাট সদর হাসপাতালের সুধীর ডোম দীর্ঘ ২০/২২ বছরে নানা শ্রেণির মানুষের লাশ কাটার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, লেখাপড়া শিখে ডাক্তার হয়ে সাহেবরা মানুষের লাশের ময়না তদন্ত রিপোর্ট করেন। পুলিশ সাহেবরা লাশ নিয়ে এসে লাশ মর্গে রেখে আদেশ নির্দেশ করেন। এ সব সাহেবদের সম্মান দেখে মনে হয় যতই কষ্ট হোক নিজের ৩টি ছেলেকে লেখা-পড়া শিখাতে পারলে বড় হয়ে ওরা সাহেব হবে। সরকারি কোয়ার্টারে থাকবে, ডোম বলে কেউ ঘৃণার চোখে দেখবে না এবং পিতার মতো নোংরা জীবন-যাপন করতে হবে না। সুধীর ও তার বয়োবৃদ্ধ পিতা হিরু ডোম দাবি করে এ প্রতিবেদককে বলেন, এ দেশের প্রতিটা জেলায়ই হরিজন কলোনী আছে, অথচ বাগেরহাটে কোন হরিজন কলোনী নাই, তাই সরকারি খাস জমিতে শুধু হরিজনদের জন্য একটি কলোনী বরাদ্দ দিলে এখানে সকল শ্রেণির হরিজনদের জন্য স্কুল করে ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ হতো। বাংলাদেশ দলিত পরিষদের বাগেরহাট জেলা শাখার সভাপতি কালিদাস চন্দ্র দাস বলেন, দলিত শ্রেণির মানুষের ছেলেমেদের জন্য পৃথক কোন সুযোগ সুবিধা নেই। দলিতদের আর্থিক দৈন্যতার কারণে ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করতে পারে না। বাগেরহাট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ মুজিবর রহমান খান দলিত সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার বিষয়ে বলেন, কোচিং বাণিজ্য, প্রাইভেট এবং অবৈধ গাইড বই বন্ধ করে একাডেমিক শিক্ষা সার্বজনীন করার সিদ্ধান্ত সরকারের রয়েছে। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অনৈতিক অর্থলোভীদের কারণে সরকারের এ উদ্যোগ কাজে আসছে না। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের উপ-পরিচালক টি এম জাকির হোসেন বলেন, “ধনী-দরিদ্র ও দলিত স¤প্রদায়ের ছেলে-মেয়েরা যাতে সরকারি সুবিধা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে লেখাপড়া করতে পারে এজন্য শিক্ষকদের অবৈধ কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানো ব্যবসা বন্ধ করার সার্বিক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।”
– আজাদুল হক, দৈনিক সংবাদের বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি এবং শারি’র দলিত ও মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments