কৃষি অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে নওগাঁর প্রান্তিক জনগোষ্ঠী

 Posted on


মো. আতাউর রহমান, নওগাঁ :: ঐতিহাসিক ভাবে নওগাঁ জেলাটি একটি কৃষি নির্ভর এলাকা। কৃষি ও কৃষি সংশ্লিষ্ট শিল্পই হলো জেলায় বসবাসরত মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন। জেলায় চাতাল কল ছাড়া অন্যকোন শিল্প প্রতিষ্ঠান না থাকায় কৃষিকে আঁকড়ে ধরেই সকল শ্রেণির মানুষের জীবন-জীবিকা আবর্তিত হয়ে থাকে। ৯৯টি ইউনিয়ন ও ১১টি উপজেলা নিয়ে নওগাঁর প্রশাসনিক এলাকা বিস্তৃত। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী নওগাঁ জেলায় ২৬লাখ ১শত ৫৭ জনগোষ্ঠীর বাস। এর মধ্যে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪লাখ ৬৬হাজার ৪শত ৬৬জন। অর্থাৎ মোট জনগোষ্ঠীর শতকরা প্রায় ১৮ভাগ সংখ্যালঘু। সংখ্যালঘুদের মধ্যে শতকরা প্রায় ২ভাগ আদিবাসী জনগোষ্ঠী। এছাড়াও নওগাঁর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রায় সহ¯্রাধিক দলিত জনগোষ্ঠী বাস করছে। যাদের রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য, ভাষা ও সংস্কৃতি।

নওগাঁ জেলায় বসবাসরত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ কৃষি, কৃষি নির্ভর শিল্প, হস্তশিল্প ও মৃৎ শিল্পের উপর নির্ভরশীল। ঐতিহ্যগতভাবে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী বিশেষ করে আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠীর মানুষরা শিক্ষায় অনগ্রসর হওয়ার কারণে এবং কৃষি বহির্ভুত কাজে তাদের বিকল্প দক্ষতা না থাকায় কৃষি ও কৃষি কাজ ছাড়া অন্য পেশায় তারা নিজেদের নিয়োজিত করতে পারেনি। সম্প্রদায় ভিত্তিতে নওগাঁ জেলায় বসবাসরত সংখ্যালঘুদের আবার রয়েছে আলাদা পেশা। এ জেলায় কামার, কুমার, মুচি, নাপিত, সুইপার, হাঁড়ি, ডোম, জেলে ইত্যাদি পেশার মানুষ বাস করে থাকে। তবে এ সকল বিশেষায়িত পেশার পাশাপাশি সংখ্যালঘুরা মৌসুমের সময় কৃষি কাজের সাথে নিয়োজিত থাকে। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই তাদের একাধিক পেশায় নিজেদের নিযুক্ত করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের ফলে বিদ্যালয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে আদিবাসী ও দলিত শিক্ষার্থীদের অভিগম্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কিছু শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে তৈরি হয়েছে। কিন্তু সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় তাঁরা চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে না পারায় শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।

স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সুদূরপ্রসারী অবদান রেখে চলেছে। এ জেলায় বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠী প্রায় শতভাগ কৃষি মজুরের উপর নির্ভরশীল। এছাড়াও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ পরিবারই কৃষি মজুরের উপর নির্ভরশীল। জেলার সম্পদের মালিকানা কতিপয় ভ‚-স্বামীর হাতে ন্যস্ত। জেলায় বসবাসরত সংখ্যালঘুরা যদি মাঠে কৃষি মজুরের কাজ না করতো তাহলে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনীতির চাকা অচল হয়ে পড়তো। ভৌগোলিকভাবে নওগাঁ জেলাটি নদী তীরবর্তী এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় এর দোঁয়াশ মাটিতে সারাবছর উন্নত জাতের ধান ছাড়াও বছরব্যাপী নানারকম শস্য উৎপাদিত হয়ে থাকে। এ সকল শস্য ও ফল দেশ ও বিদেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। যা থেকে দেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে থাকে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত প্রান্তিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষরা যদি কৃষি মজুরের কাজ না করতো তাহলে ভ‚-স্বামীরা শ্রমিকের অভাবে তাদের জমিতে ফসল ফলাতে পারতো না। এর মাধ্যমে উৎপাদনের পরিমাণ কম হতো এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তো।

দেশের প্রান্তিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী কৃষি, কুটির শিল্প, হস্তশিল্প ও মৃৎশিল্পের বিকাশে সুদূরপ্রসারী অবদান রেখে চললেও তারা এই অবদানের কোন স্বীকৃতি পায়না। বরং ভ‚-স্বামী ও শিল্প মালিকরা প্রান্তিক সংখ্যালঘু শ্রমিকদের শোষণ করে নিজেরা অর্থ-সম্পদ গড়ার লালসায় মেতে ওঠে। প্রান্তিক শ্রমিকদের শ্রম শোষণ করে তারা তৃপ্তির স্বাদ গ্রহণ করে। দেশের বিপুল সংখ্যক সংখ্যালঘু প্রান্তিক মানুষ কৃষি মজুরের সাথে জড়িত থাকলেও তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোন নীতিমালা ও কাজের স্বীকৃতি নেই। এছাড়াও রয়েছে সংখ্যাগরিষ্ট ও সংখ্যালঘু শ্রমিকদের মাঝে মজুরী বৈষম্য এবং নারী-পুরুষের মধ্যে মজুরী বৈষম্য। যা কোনভাবে কাম্য হতে পারে না।

এ বিষয়ে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের পতœীতলা উপজেলা শাখার সভাপতি মিঃ সুধির চন্দ্র তির্কির মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, নওগাঁ জেলার ৯৫ ভাগেরও বেশি আদিবাসী ভ‚মিহীন ও কৃষি মজুর। জেলার প্রায় ২৫হাজার আদিবাসী পরিবার কৃষি মজুরের সাথে যুক্ত হলেও কৃষি শ্রমিকদের জন্য কোন নীতিমালা নেই। এ কারণে আদিবাসীদের শ্রম শোষকের প্রতিযোগিতা চলছে। এই অসম শ্রম শোষণের প্রতিযোগিতা অনভিপ্রেত। আমরা আদিবাসী-বাঙালি ও নারী-পুরুষ মজুরী বৈষম্য রোধে কাজ করে যাচ্ছি। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি গৌতম দে বলেন, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী যাতে নিজেদের পেশায় সম্মানের সাথে টিকে থাকতে পারে এবং মর্যাদা পায় সে লক্ষ্যে আমাদের সংগঠন কাজ করছে।

কৃষি, কুটির শিল্প, হস্তশিল্পের সহিত যে সকল সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী জড়িত আছে একটি যুগোপযোগী জরিপের মাধ্যমে তাদের সঠিক সংখ্যা নিরুপণ করা, অতি প্রান্তিক শ্রমিকদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুটির শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক কৃষি মজুরের অধিকার রক্ষার স্বার্থে সরকারের তরফ থেকে কৃষি মজুর সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার বলে মনে করেন এই সংখ্যালঘু নেতারা।

মো. আতাউর রহমান, পতœীতলা (নওগাঁ) উপজেলা প্রতিনিধি, দৈনিক সকলের খবর ও শারির মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য

Facebook Comments