করোনাকালে দলিত সমাজের নিত্য চাহিদা পুরনে সরকারী-বেসরকারী অবদান

 Posted on

\মাহমুদুল গনি রিজন \
না! কোন গোলাবারুদ,কামান এমন কি রাসায়নিক কোন অস্ত্র দিয়ে নয়। বিনা অস্ত্রের যুদ্ধ চলছে পৃথিবীব্যাপী। কোভিড-১৯ বা করোনা নামক একটি ভাইরাসের বিরুদ্ধে। যুদ্ধের প্রতিপক্ষ পৃথিবীর প্রায় ৬শ কোটি মানুষ। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন যুদ্ধ দেখেনি কেউ। মানবসৃষ্ট যুদ্ধ জয়ের সব ধরণের রণকৌশল,রণনীতি সবকিছুই স্থবির হয়ে আছে। কোন কিছুই কাজে আসছে না। ভিন্ন ধরণের এই যুদ্ধে পৃথিবীর এমন বিপর্যয় আর কখন হয়নি। গত বছর ডিসেম্বর মাসে চীনের ঊয়ান প্রদেশ থেকে শুরু হয় এই করোনা ভাইরাসের আক্রমন। যা গত ১০ মাসে আঘাত হানতে হানতে ছড়িয়েছে পৃথিবীময়। ইতোমধ্যে করোনা নামের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ,সংক্রামিত তিন কোটি ছাড়িয়েছে। অপ্রতিরোধ্য করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে অনিশ্চিত এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে,পৃথিবীর কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। বিশ্বের বড় বড় বিজ্ঞানীরা প্রতিকারে দিনরাত এক করে ফেলছেন। বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৫০টি প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা এই মুহুর্তে লিপ্ত আছেন করোনার প্রতিষেধক আবিস্কারে। সম্ভবনার অনেকগুলো দিক বের হলেও কোনটাতেই যেন নিশ্চিত হতে পারছেন না কেউ।
বৈশ্বিক এই মহামারি বাংলাদেশে ৮মার্চ করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর শুরু হয় আমাদের করোনা মোকাবেলা প্রক্রিয়া। সরকার ১৭ মার্চ থেকে দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। দফায় দফায় ৩১ মে পর্যন্ত চলে সাধারণ ছুটি। করোনা নামের মহামারিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক,রাজনৈতিক সামাজিক সকল শক্তি সাধারণ ছুটি বাড়ানোর দাবি জানায়। কিন্তু সরকার সাধারণ ছুটি না বাড়িয়ে জীবনের ঝুঁকি উপক্ষো করে জীবিকার সন্ধানে নামে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, জীবন জীবিকা একসাথে চালিয়ে নিতে হবে। শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে ধীরে ধীরে খুলে দেয়া হল সমস্ত কিছু। শুরুতেই সংসদ সদস্যদের একরকম বাদ দিয়ে আমলাদের উপর নির্ভর করে করোনার মত এই বৈশ্বিক মহামারি ঠেকানোর উদ্যোগ নিলে সরকার।
সাধারণ ছুটির এই সময়ে সরকার নি¤œ আয়ের প্রায় দুইকোটি মানুষকে টার্গেট করে প্রণোদনাসহ জীবিকার জন্য কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করলো। তারমধ্যে অস্থায়ী রেশন কার্ড,ওএমএস ও নগদ অর্থ প্রদান। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এই উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়। কিন্ত বিপত্তি ঘটলো বাস্তবায়নে। প্রণোদনার টাকা আর চাল বিতরণের তালিকা প্রস্তুতিতে দেখা দিল অসংখ্য অসংগতি,অনিয়ম,দুর্নীতি। এই দুর্নীতির চিত্র ইউনিয়ন থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত। জড়িতদের তালিকায় নাম উঠে এলো ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান,মেব্বার সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের। গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন বের হল।

এমতাবস্থায় গাইবান্ধায় আদিবাসী এবং দলিত জনগোষ্ঠীর পরিবার ভিত্তিক যে পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় গাইবান্ধা জেলায় মোট ৭২০৮টি পরিবার আছে। এরমধ্যে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় আদিবাসী ১৩৭৮,রবিদাস,হরিজন ও অন্যান্য মিলে ৩৬৩ মোট ১৭৬১ পরিবার। পলাশবাড়ী উপজেলায় আদিবাসী না থাকলেও রবিদাস,হরিজন ও অন্যান্য মিলে মোট ৫০৩ পরিবার।
সাদল্লাপুর উপজেলায় আদিবাসী ৬৫টি পরিবার,রবিদাস,হরিজন ও অন্যান্য মিলে ৪৬৫সহ মোট ৫০০ পরিবার। গাইবান্ধা সদর উপজেলায় আদিবাসী না থাকলেও রবিদাস,হরিজন ও অন্যান্য মিলে মোট ১৪৩৩ পরিবার। সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় আদিবাসী না থাকলেও রবিদাস,হরিজন ও অন্যান্য মিলে মোট ১০৬৮টি পরিবার। ফুলছড়ি উপজেলায় আদিবাসী না থাকলেও রবিদাস,হরিজন ও অন্যান্য মিলে মোট ১২২৫টি পরিবার। সাঘাটা উপজেলায় আদিবাসী না থাকলেও রবিদাস,হরিজন ও অন্যান্য মিলে মোট ৪৭০ পরিবার এবং গাইবান্ধা পৌরসভায় আদিবাসী না থাকলেও রবিদাস,হরিজন ও অন্যান্য মিলে মোট ২৬৮টি পরিবার রয়েছে।

করোনাকালে এই ভয়াবহতার শিকার হয়েছেন ৭২০৮টি পরিবারের মধ্যে প্রায় সবগুলো পরিবারেই। কিন্তু সরকারী ও বেসরকারি সাহায্যের পরিমান ছিল খুবই সীমিত। সরকারী বেসরকারী সাহাযোর প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ি দেখা যায়, ত্রাণের তালিকা অনুযায়ি জেলা সমাজ সেবা থেকে ১২০ জনকে ১হাজার টাকা করে মোট ১লক্ষ ২০হাজার টাকা। এক কালিন ৪ হাজার টাকার চেক প্রদান ৩০ জন কে মোট ১লক্ষ ২০হাজার টাকা । এস কে এস ফাউন্ডেশন থেকে ৬০ জন কে ১হাজার করে মোট ৬০ হাজার টাকা, এবং গাইবান্ধা পৌরসভা থেকে ৫০ টি রবিদাস ও ১২০টি হরিজন পরিবার কে ১০ কেজি চাল, আলু ৩ কেজি, তেল ১ লিটার ডাল ১ কেজি লবন ১ কেজি, দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উপজেলা থেকে ২৫-৩০ জন কে ১ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন থেকে ৫৫০ টি দলিত পরিবার কে চাল ১০কেজি, আটা ৫কেজি, চিড়া ১কেজি, তেল ২লিটার, লবন ১কেজি, চিনি ২কেজি, মুসুর ডাল ২কেজি, সেবলন সাবান ২টি। আলু:৫ কেজি, পিয়াজ:৩ কেজি খাদ্য সামগ্রী ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হয়। এছাড়া এমনিতেই চাল,ডাল তেল জেলা সমাজ সেবা অফিস থেকে বিচ্ছিন্নভাবেও কিছু দেওয়া হয়েছিলো । এদিকে করোনাকালে এই ভয়াবহতার মাঝে দলিতদের সরাসরি না দিলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল,সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন এপ্রিল মে মাসের বিচ্ছিন্নভাবে দলিতদের কিছু সহযোগিতা করেছে। যেটির কোন পরিসংখ্যান জানা যায়নি।
এ প্রসঙ্গে রবিদাস ফোরাম,গাইবান্ধার সাধারণ সম্পাদক খিলন রবিদাস জানান, করোনাকালে এই ভয়াবহতা সময় পুরো জেলায় যে সরকারী সাহায্য সহযোগিতা পাওয়া গেছে তার পরিমান ছিল খুবই সামান্য। আদিবাসীদের বাদ দিলেও জেলায় ৫৭৬৫টি দলিত পরিবার রয়েছে। যাদের খুবই কম সংখ্যক পরিবার ছাড়া প্রায় সবগুলো পরিবার হত দরিদ্র। কিন্তু সে তুলনায় সাহায্য ছিল খুবই অপ্রতুল। পরিবার ভিত্তিক ধরলে তা কোন ভাবেই সর্বোচ্চ ২হাজার পরিবারের বেশী হবে না। বাকী সাড়ে তিন হাজাররেও বেশী পরিবার করোনাকালে কোন সরকারী বা বেসরকারী সাহায্য পায়নি। এখন পাচ্ছে না। করোনা কালে কাজ না থাকা এবং সরকারী-বেসরকারি সাহায্য না পেয়ে তারা মানববেতর জীবন করছে।

একই প্রসঙ্গে রবিদাস ফোরাম, গাইবান্ধার সভাপতি সুনীল রবিদাস বলেন, গত ৫/৬ মাস ধরে আমাদের কোন কাজ নেই বললেই চলে। আগে যেখানে সারাদিনে ৩/৪শত টাকা আয় হতো, সেখানে এখন সারাদিনে ১৫০/- টাকার বেশী হয় না। এই টাকা দিয়ে সংসার চালানো খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। করোনা ভাইরাসের সময় সরকারের যৎসামান্য সহযোগিতা আর কিছু এনজিও প্রথম দিকে সাহায্যের হাত বাড়লেও এখন আর সেটিও পাওয়া যাচ্ছে না। অতি কষ্ঠে জীবনযাপন করছে গাইবান্ধার দলিত সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো।
মাহমুদুল গনি রিজন, জেলা প্রতিনিধি,দৈনিক সংবাদ ও রেডিও টু-ডে, সদস্য,বাংলাদেশ দলিত এন্ড মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম।

Facebook Comments