অমল স্যারের পাঁজরে মৃত্যুর চিহ্ন বহমান

 Posted on

বিধান সরকার, অতিথি প্রতিবেদক, বরিশাল: অস্তগামী নয়; উদিত সূর্যকেই প্রণাম করে সবাই। চিরায়ত সত্যি এই কথার পেছনে এক দীর্ঘ বেদনা বহমান। ফিরবার বেলায় অমনি কথা কানে বাজায় মনে পড়ে অন্ধ কবি হোমারের সেই বিখ্যাত উক্তি “প্রতিটি দুঃখী আত্মাই সততার প্রতীক”। তাইতো দুঃখ-কষ্ট উভয়কে বহন করে চললেও তার সততার বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের সূযোগ নেই কর্মযজ্ঞ শুরুর থেকে আজ অবধি। সুযোগ ছিল; সম্পদ ও সম্পত্তি দুই ছিল। তবে নিরীহ গোছের আর মায়ের প্রতি অগাধ ভক্তি বলে দুষ্টদের সাথে পেরে ওঠেননি। বরিশাল নগরীর নতুন বাজারের সম্পত্তি বেহাত হয়েছে অনেক আগে। শিক্ষকতা থেকে অবসরে গেছেন তাও প্রায় দেড় দশক হবে। মেয়েদের বিয়েতে বিক্রির পর অবশিষ্ট বলতে দু’একর সম্পত্তি। ওই দিয়ে টেনেটুনে চলতে হচ্ছে শরিকল হাইস্কুলের এক সময়ের ডাকসাইটে ইংরেজীর শিক্ষক অমল কৃষ্ণ চক্রবর্তীকে (৮৫)। এর সাথে বয়ে বেড়াচ্ছেন দীর্ঘ ৪৪ বছর যাবত মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে কাছ থেকে হত্যার উদ্দেশ্য পাক সেনাদের আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ছোড়া গুলির ফলে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসার যন্ত্রণা। সম্প্রতি গৌরনদী উপজেলার সমৃদ্ধ জনপদ আধুনাতে ৭১-এ দেশীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের তান্ডব সম্পর্কে জানতে আমাকে সহায়তা করেন শরিকল নিবাসী সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব কাজী বোরহানুল ইসলাম। তিনিই নিয়ে যান নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলেও শরীরে ক্ষত চিহ্ন বহমান অমল স্যারের আধুনা গাঁয়ের বাড়িতে। চির শান্ত স্বভাবের অমল স্যার স্মৃতি হাতড়ে বর্ণনা করলেন সেই বিভিষিকাময় দিনগুলোর কথা।

বরিশাল নগরীতে ১৯৩৫ সালে জন্ম অমল কৃষ্ণ চক্রবর্তীর। পিতা ললিত কুমার চক্রবর্তী ছিলেন বিএম স্কুলের শিক্ষক। শংকর মঠে প্রাথমিকের পাঠ সমাপ্ত করে বিএম স্কুলে ভর্তি হয়ে ১৯৫১ সালে মেট্রিক পাশ করেন। এরপর বিএম কলেজ থেকে বিএ পাশ করে চন্দ্রহার হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। এর ২ বছর পর যোগ দেন শরিকল হাইস্কুলে ইংরেজী বিভাগের শিক্ষক পদে। এখান থেকেই ২০০০ সালে অবসরে যান তিনি। কিছুটা স্মৃতি ভ্রম হয় বলে ৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে আসা কষ্টের সেই  বর্ণনায় সহায়তা করেন স্ত্রী দীপু চক্রবর্তী। তিনি জানান, মাহিলাড়া বাজার সংলগ্ন রাজাকার খাদেম মিলিটারীর সহায়তায় ৭ বার পাক সেনারা আক্রমণ করে এই আধুনা গাঁওখানিতে।

গুলি চালিয়ে হত্যা করে প্রভাত ব্যানার্জী, জগদীশ মন্ডল, নলিনী মিস্ত্রি ও কিশোর বয়সী দিলীপকে। ওদিনই গুলি করেছিল হত্যার জন্য অমল স্যারকেও। এ ঘটনা স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর মাস দু’য়েক পরের কোন এক সোমবার দিনের। গৌরনদী ক্যাম্প থেকে পাক সেনারা আসি আসি করে সত্যিই সেদিন রাজাকার খাদেম মিলিটারী পথ দেখায়ে নিয়ে আসে আধুনা গ্রামে। খবর পেয়ে যে যার মত করে পালাতে থাকলে বৃদ্ধ মাতাকে নিয়ে অমল চক্রবর্তী বসন্ত দত্তের বাড়িতে আশ্রয় নেন। কাউকে না পেয়ে বসত বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় পাক বাহিনী রাজাকারদের সহায়তায়। এরপর আশ্রয়স্থল বসন্ত দত্তের বাড়িতেও আগুন লাগানো হলে জীবন বাঁচানোর জন্য মাকে নিয়ে প্রফুল¬ দত্তের বাগানে পালিয়ে থাকেন। পাক সেনারা তান্ডব শেষে চলে যাবার কালে বাগান থেকে বের হওয়া মাত্রই অমল স্যারকে ধরে ফেলে। পড়নে লুঙ্গি ছিল বলে মনে করেছিল মুসলমান কৃষক হবে! এরপর হট্ যাও বলে কমান্ড করলে কিছুদূর যাওয়ার পর ৫/৬ জন পাকসেনা এসে ফের দু’হাত টেনে ধরে এবং অপর এক সেনা খুউব কাছ থেকে বাম পাঁজরে গুলি চালায়। নিশ্চিত মৃত্যু ভেবে পাকিরা চলে যায় গৌরনদী ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। বৃদ্ধ মা ছেলের অমনি অবস্থা দেখে রক্তের বাঁধ মানাতে নিজের পুরো শাড়িটি দিয়ে চেপে ধরেন পিঠের দিকটাতে। গুলি বের হয়ে যাবার ফলে যেখানে একটা বড় আকারের গর্ত তৈরী হয়েছিল। আর সেই চিহ্ন এখনো বিদ্যমান অমল স্যারের শরীরে।

তখন স্ত্রী দিপু চক্রবর্তী সন্তান সম্ভবা বলে চলে গিয়েছিলেন বাবার বাড়িতে। স্বামীর গুলিবিদ্ধের কথা শুনে তিনি ফিরে আসেন। দিপু চক্রবর্তী একথা বর্ণনার মধ্যে অমল স্যার অনেকটা আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন, শরিকলের সৈজদ্দি ডাক্তার প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা না করলে তিনি কোনমতেই বাঁচতে পারতেন না। এজন্য কৃতজ্ঞতা জানতে আজো ভুল করেন না স্যার। কারো কোন বাঁধা নিষেধ না মেনেই পল্ল¬ী ডাক্তার সৈজদ্দি নিয়মিত ড্রেসিং ও ইনজেকশান পুশ করেছেন। সৈজদ্দি এও বলেছিলেন টাকা না পেলেও তিনি অমল বাবুর চিকিৎসা করবেন, তাকে ভালো করে তুলবেন। ধীরে ধীরে অমল স্যার সুস্থ হয়ে উঠতে প্রায় দু’মাস চলে যায়। চলমান স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্যদিনে একদা ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন মা এবং পরিবার পরিজন সমেত।

২১ দিন পথ চলা পর পশ্চিমবঙ্গের কালিঘাটে মামা শ্বশুড়ের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছেন। এরপর পুরুলিয়া হাসপাতালে অপারেশন করে শরীরে থাকা গুলির অংশ তোলা হয়। দেশ স্বাধীন হলে ফিরে আসেন আধুনা গাঁয়ের পোড়া ভিটায়। উপার্জন বলতে শরিকল হাই স্কুলে শিক্ষকতা। ফলে কোনমতে ছাপড়া তুলে পোড়া ভিটায় বসত করতে থাকেন। দীর্ঘ তিন দশক পর চাকুরী থেকে অবসরকালে প্রাপ্ত কল্যাণ তহবিলের টাকায় কোন মতে একখানা ঘর তৈরী করেন। বিশেষ করে মেয়েদের বিয়ের কথা চিন্তা করেই ঘরখানি তোলা। জমি যা ছিল তিন মেয়ের বিয়েতে কিছুটা বিক্রি করতে হয়েছে। বাদবাকি জমিতে পানের বরজ আর একটি পুকুরে মাছ চাষে যা আয় হয়, তাই দিয়ে কোন মতে দিন গুজরান করেন অমল কৃষ্ণ চক্রবর্তী। শান্ত স্বভাবের এই ভদ্র লোকের যেন কোন চাওয়া-পাওয়া নেই। আর আক্ষেপও নেই পাকসেনা ও রাজাকারদের হামলার ক্ষতির প্রভাব আজো কাটিয়ে উঠতে পারেননি বলে। তাঁর ভাষায় বর্বর পাকসেনা ও তাদের দোসর রাজাকারদের দ্বারা এমনি ক্ষতি হয়েছে দেশের লাখো মানুষের। এদেরি একজন তিনি।

লেখকঃ বিধান সরকার, গল্পকার।

Facebook Comments