অনেক জমি হাতছাড়া অস্তিত্ব সংকটে প্রাচীন চৈত্রহাটি মন্দির

 Posted on

উল্লাপাড়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নে চৈত্রহাটি গ্রাম। এই গ্রামে প্রায় আড়াইশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রীশ্রী জগদিশ্বরী মাতা মন্দির। স্থানীয়ভাবে এটি চৈত্রহাটি মন্দির নামেই অধিক পরিচিত। নাটোরের ধরইল গ্রামের জমিদার হরেন্দ্রনাথ চৌধুরী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ চৌধুরী, বিজেন্দ্রনাথ চৌধুরী ও বিনোদ বিহারী চৌধুরী মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন বলে স্থানীয় হিন্দু নেতারা জানান। এখানে স্থাপন করা হয় কষ্টিপাথরের বড় কালীমূর্তি। প্রতিষ্ঠাতা জমিদাররা উল্লাপাড়ায় এ মন্দিরের জন্য বিপুল জমি ও পুকুর দান করেন। সিএস রেকর্ডে মন্দিরের নামেই জমিদারদের দান করা ওই সম্পত্তি রেকর্ড হয় বলে দাবি করেন স্থানীয় আদিবাসীরা। তবে ভূমি অফিসে এ বিষয়ে কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। আদিবাসীদের তথ্যমতে, সিএসের পরে যেসব রেকর্ড হয়েছে, তাতে ক্রমাগত মন্দিরের সম্পত্তি কমে যায়। সবশেষে ১৯৭৭ সালে আরএস রেকর্ডে জগদিশ্বরী মন্দিরের ৩৩.৪৩ একর জমি ও পুকুর সরকারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানে চলে যায়। তিন বছর আগেও মন্দিরের জমি উপজেলা ভূমি অফিস থেকে বার্ষিক লিজ দেওয়া হতো। তবে একটি মামলার কারণে এখন সেটি বন্ধ থাকলেও একটি পক্ষের ভোগদখলেই আছে এসব জমি। জানা যায়, উপজেলার তেলিপাড়া গ্রামে মন্দিরের নামে এখন মাত্র ৪০ বিঘা জমি রয়েছে।
এ অবস্থায় জগদিশ্বরী মাতা মন্দিরের অস্তিত্ব নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন স্থানীয় আদিবাসীরা। তাদের অভিযোগ, মন্দির পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তির দায়িত্বহীনতায় মন্দিরের শতাধিক বিঘা জমি ও পুকুর এখন সরকারি খাস জমিতে (ক-তফসিলভুক্ত) পরিণত হয়েছে। এভাবে একের পর এক হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে জমি। এরই মধ্যে চুরি হয়ে গেছে কষ্টিপাথরের বড় কালীমূর্তি, বাসনকোসনসহ মূল্যবান জিনিস। সব মিলিয়ে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে পুরো মন্দির ভবন। প্রশাসন মন্দির পাহারায় পুলিশ মোতায়েন করেছে।
স্থানীয় দরিদ্র আদিবাসীরা জানিয়েছেন, মন্দির পরিচালনায় কমিটি থাকলেও স্থানীয়ভাবে তারাই মূলত নিয়মিত পূজা-অর্চনাসহ এর দেখভাল করেন। অথচ মন্দির ঘিরে যেসব জমি আছে তা চাষাবাদ কিংবা ভোগদখলের অধিকার তাদের নেই। দীর্ঘদিনেও তাদের এ-সংক্রান্ত দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। আদিবাসীদের তথ্যমতে, চৈত্রহাটি গ্রামের ৩০টি আদিবাসী পরিবার দীর্ঘকাল ধরে ওই মন্দির দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে। চাঁদা তুলে তারা দৈনন্দিন পূজা-অর্চনা, ভোগ ও নানা আচার-অনুষ্ঠান করে থাকেন।
মন্দিরের বর্তমান অবস্থা সরেজমিন দেখতে গেলে স্থানীয় আদিবাসীরা অভিযোগ করেন, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের প্রফুল্ল নন্দীর পরিবার জমিদারদের কাছ থেকে সেবাইতের দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন এই মন্দির পরিচালনা করেছে। প্রফুল্ল নন্দী মারা যাওয়ার পর তার দুই ছেলে প্রলয় নন্দী রমেন ও রথীন্দ্রনাথ নন্দী প্রণব পর্যায়ক্রমে সেবাইতের দায়িত্ব পালন করেন। সবশেষে এই পরিবারের সদস্য প্রণব সেবাইতের দায়িত্বে ছিলেন।
বছর তিনেক আগে সেবাইতদের ব্যাপারে নানা অভিযোগ ওঠায় প্রণবকে অব্যাহতি দিয়ে মন্দির পরিচালনার জন্য ১৭ সদস্যের কমিটি গঠন করে উল্লাপাড়া উপজেলা প্রশাসন। এ কমিটিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি ও উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি গৌতম কুমার দত্তকে সম্পাদক করা হয়। বর্তমানে এই কমিটি মন্দির পরিচালনার দায়িত্বে আছে।
আদিবাসীরা আরও অভিযোগ করেন, সেবাইতরা নানাভাবে ভোগদখল করার ব্যবস্থা করে নেন বেশ কিছু জমি। ফলে স্থানীয় আদিবাসীদের মন্দিরের জমি বা পুকুর ভোগদখলের কোনো দাবি বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে মন্দিরের খাস খতিয়ানভুক্ত জমির বিরাট অংশ চৈত্রহাটি গ্রামের প্রভাবশালী দেলবার হোসেন ও তার দলের লোকজন লিজ নিয়ে এবং কিছু জমি লিজ না নিয়েও ভোগদখল করছেন।
আদিবাসীদের মধ্যে জগদিশ্বরী মন্দিরের গীতা শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক সানজিদা রানী মুরারী, চৈত্রহাটি গ্রামের মহারানী মুরারী, পলাশ মুরারী, আলপনা মুরারীসহ বেশ কয়েকজন অভিযোগ করেন, মন্দিরের সামনের পুকুরে চলতি বছরের মার্চে দেলবারের নেতৃত্বে লোকজন মাছ মারতে নামে। আদিবাসীরা তাতে বাধা দিলে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। সংঘর্ষে এই গ্রামের কোরবান আলী নামের এক ব্যক্তি খুন হন। আদিবাসীদের বক্তব্য- দেলবারের লোকজনের আঘাতেই কোরবানের মৃত্যু হয়েছে। এই সংঘর্ষে আদিবাসীদের অন্তত ২০ জন আহত হন। সংঘর্ষের একপর্যায়ে দেলবারের লোকজন মন্দির ভবন ভাঙচুর করে। এ ঘটনার পর দেলবারের ছেলে আব্দুল হান্নান ২০ আদিবাসী পুরুষকে আসামি করে সলংগা থানায় খুনের মামলা করেন। একই সময় আদিবাসীদের পক্ষ থেকেও জিতেন মুরারী দেলবার বাহিনীর বিরুদ্ধে একই থানায় মারধর ও মন্দির ভাঙচুরের অন্য একটি মামলা করেন।
আদিবাসীরা জানান, দেলবারপক্ষের খুনের মামলার কারণে আদিবাসী পল্লির পুরুষরা গ্রেপ্তারের ভয়ে অন্যত্র পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ফলে পরিবারগুলো মারাত্মক সংকটে পড়েছে। এসব পরিবারের গৃহবধূরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আদিবাসীদের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে মন্দিরের তালা ভেঙে কষ্টিপাথরের মূল্যবান কালীমূর্তি চুরি করা হয়। সে সময় আদিবাসীরা চাঁদা তুলে ভারত থেকে একটি সাধারণ পাথরের কালীমূর্তি কিনে এনে মন্দিরে আবার প্রতিষ্ঠা করেন। সম্প্রতি আবারও মন্দিরের তালা ভেঙে বর্তমান কালীমূর্তির গায়ে থাকা প্রায় পাঁচ ভরি স্বর্ণের অলঙ্কার ও মন্দিরের ব্যবহূত মূল্যবান বাসনপত্র চুরি হয়। মন্দির সংশ্নিষ্ট সব ঘটনা ও অপকর্মের জন্য দেলবারের লোকজনকেই দায়ী করেন আদিবাসীরা। মন্দিরের সম্পত্তি ভোগদখলের সুযোগ দেওয়া এবং খুনের মামলা থেকে মুক্ত করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন তারা।
আদিবাসীদের অভিযোগের ব্যাপারে চৈত্রহাটি গ্রামের দেলবার হোসেনের সঙ্গে কথা বললে তিনি নিজের এবং তার লোকজনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেন। দেলবার দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে তার লোকজন মন্দিরের জমি লিজ নিয়ে ভোগদখল করছেন। মন্দিরের তালা ভেঙে একাধিক চুরির ঘটনার সঙ্গে তার লোকজনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
উল্লাপাড়া উপজেলা ভূমি অফিসে জগদিশ্বরী মন্দিরের জমির অবস্থা জানতে গেলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাহিদ হাসান খান জানান, চৈত্রহাটি জগদিশ্বরী মন্দিরের ৩৩.৪৩ একর জমি ও পুকুর সরকারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত বলে রেকর্ড রয়েছে। এসব জমি ভূমি অফিস থেকে বার্ষিক লিজ দেওয়া হয়। তবে ২০১৭ সালে দেলবার হোসেন মন্দিরের ফসলি জমি ও পুকুর একই সঙ্গে লিজ পাওয়ার জন্য সিরাজগঞ্জ আদালতে মামলা করেন। আদালত গত ১৬ ফেব্রুয়ারি এ মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মন্দিরের ক-তফসিলভুক্ত সব ফসলি জমি ও পুকুরে স্থিতাবস্থা দিয়েছেন।
আদিবাসীদের অভিযোগের ব্যাপারে জগদিশ্বরী মন্দিরের সেবাইত পরিবারের সর্বশেষ সেবাইত রথীন্দ্রনাথ নন্দী প্রণব তার ও তার পরিবারের লোকজনের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ মিথ্যা দাবি করেন। প্রণবের দাবি, মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতারা জমি দানের পর মন্দিরের নামে জমির কাগজপত্র করে দেননি। ফলে কোনো রেকর্ডেই এসব সম্পত্তি মন্দিরের নামে রেকর্ড সম্ভব হয়নি। তবে এই জমির লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রে আদিবাসীদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। উল্লাপাড়া আদিবাসী পরিষদের সভাপতি সুশীল মাহাতো আদিবাসীদের দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান।
কোরবান খুনের মামলায় পুরুষশূন্য আদিবাসী পল্লির গৃহবধূদের নিরাপত্তাহীনতার ব্যাপারে থানার ওসি জেড জেড এম তাজুল হুদা বলেন, মন্দির ও আদিবাসী পল্লির নিরাপত্তার জন্য পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। দেলবার ও আদিবাসীদের মামলা অধিকতর তদন্তের জন্য জেলা গোয়েন্দা শাখায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
জগদিশ্বরী মন্দির পরিচালনা কমিটির সম্পাদক গৌতম কুমার দত্ত বলেন, মন্দিরের বেশিরভাগ জমি হাতছাড়া হয়ে গেছে। এখন তেলিপাড়া গ্রামে মন্দিরের নামে থাকা ৪০ বিঘা জমির আয় থেকে মন্দিরের বড় অনুষ্ঠান, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের কাজ পরিচালিত হয়। তিনি মন্দিরের সব জমি উদ্ধার করে পরিচালনা কমিটির হাতে ন্যস্ত করার ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আবেদন জানান।
জগদিশ্বরী মন্দির কমিটির সভাপতি ও উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেওয়ান মওদুদ আহমেদ জানান, আদালতে মন্দিরের জমি নিয়ে মামলা চলমান থাকায় কোনো পক্ষকেই এখন প্রশাসন থেকে লিজ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এই প্রাচীন মন্দিরের নিরাপত্তা রক্ষা এবং প্রতিদিনের পূজা-অর্চনা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে উপজেলা প্রশাসন।

তথ্য সূত্র: সমকাল

Facebook Comments