সাতক্ষীরায় ২০০১ এর নির্বাচন পরবর্তী সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন মানবাধিকারের কণ্ঠরোধের নামান্তর

 Posted on

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা :: জমিদখল, বাড়ি দখল, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, ধর্মান্তরকরণ, মন্দির ভাঙচুর, মিথ্যা মামলায় হয়রানি, ডাকাতি, দলীয় প্রভাবে রাজনৈতিক মামলা হিসেবে খারিজ করে দেওয়াসহ ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার নির্যাতন পোহাতে হয় বিগত ২০০১ সালের অক্টোবর পরবর্তী সাতক্ষীরার সংখ্যালঘুদের। যার স্মৃতি আজো বয়ে বেড়াচ্ছে অনেকেই। অনেকেই আবার নতুন আক্রমণের আশঙ্কায় দেশ ছেড়েছেন। বিচার না পাওয়ায় অনেকেই মুখে কুলুপ এঁটে কোন রকমে দিন পার করছেন।

এদিকে ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী প্রশাসন কঠোর হওয়ার কথা ঘোষণা দিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কার্যত তারা ছিল কাগুজে বাঘ। মামলা করলে পুলিশ তদন্ত করে অধিকাংশ মামলার বাঘা বাঘা আসামীদেরকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। আদালতে দলীয় নিয়োগপ্রাপ্ত পিপি, জিপি, সিএসআই, জিআরওসহ বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকের রহস্যজনক ভূমিকার কারনে ন্যয়বিচার ভাগ্যে জোটেনি। সরকার ও প্রশাসন সহায়ক ভুমিকা না রাখায় সহিংসতার ঘটনা কমেনি বরং বেড়েছে। সরকারের গৃহীত পদক্ষেপে খুব কম সংখ্যক সংখ্যালঘু উপকৃত হয়েছে।

কালিগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক খান আসাদুর রহমান জানান, ২০০১ সালের অক্টোবরে সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনী তফশীল ঘোষণার সাথে সাথে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের হিন্দুদের উপর জামায়াত-বিএনপির নেতা-কর্মীরা ভোট কেন্দ্রে না যাওয়া বা ভোটদানে বিরত থাকার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে। তাদের কথা না শুনলে নির্বাচনের পর পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। জামায়াত নেতা ও তারালী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল গফুরের নেতৃত্বে উপজেলার তারালী ইউনিয়নের বিশ্বনাথপুরের কওছার মোড়ল, হবি কারিকর, তেঁতুলিয়ার সোহরাব হোসেন, আতিয়ার রহমানসহ শতাধিক জামায়াত শিবিরের লোকজন ২০০২ সালের ৩১ মে উপজেলার তারালী ইউনিয়নের বিশ্বনাথপুর গ্রামে উপেন্দ্রনাথ সরকারের পাঁচ ছেলের এক একর ৬৫ শতক জমি ফুটবল খেলার মাঠ তৈরির জন্য দখল করে নেয়। ওই বছরের ১০ নভেম্বর ওই জমি দখলে নিলেও ২০০৩ সালের ৫ জুলাই সন্ধ্যায় জামায়াত নেতা আব্দুল গফুরের নেতৃত্বে সরকার পরিবারের বাড়িতে নির্মিত কালিমন্দির ভাঙচুর করা হয়। ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয় তাদের বসত বাড়ি। কেটে নেওয়া হয় ফলজ ও বনজ প্রজাতির বিভিন্ন গাছ। লুটপাটে বাধা দেওয়ায় ওই পরিবারের এক গৃহবধুকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় ধর্ষিতার ভাসুর বাদি হয়ে আব্দুল গফুরসহ নয় জনের বিদ্ধুদ্ধে থানায় মামলা(৫নং) দিলে পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। পরে আসামীদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করলেও বিচার বিভাগের উপর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ওই মামলা খারিজ হয়ে যায়। একইভাবে গাছ কাটা ও লুটপাটের অভিযোগে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও পরবর্তীতে খারিজ হয়ে যায়। বিচার না পাওয়ায় ওই পরিবারের সদস্যরা কোনভাবেই এ নিয়ে মুখ খুলতে চায় না।
২০০২ সালের ২ জুন ভোরে উপজেলার ফতেপুর গ্রামে দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোবিন্দ লাল সরদারের বাড়ি দখল করে নেয় একই এলাকার মোসলেম গাজীর ছেলে মোমিন হুজুর, মনিরুল, ফতেপুরের শিবির নেতা ওমর ফারুক, মুকুন্দ মধুসুদনপুর চৌমুুহুনীর কুদ্দুস, বিষ্ণুপুরের রবিউল ইসলামসহ একটি চক্র। তারা শুধু বাড়ি দখল করে ক্ষান্ত হয়নি। তারা গোবিন্দ লাল সরদার ও তার মা সুন্দরী বালাকে দিগম্বর করে এক সাথে বাড়ির উঠানে শিউলি ফুলের গাছের নীচে লাল পিঁপড়ার ঝাঁকের উপর বেঁধে রাখে। অস্ত্রের ঝনঝনানিতে প্রতিবেশি জয়পত্রকাটি গ্রামের অসা¤প্রদায়িক চেতনার মানুষ শহর আলী সরদার, তার ছেলে বর্তমানে বিষ্ণুপুর আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল হক, মানবাধিকার কর্মী মোসলেম আলী, শঙ্কর সরদারসহ অনেকেই তাদেরকে উদ্ধারের চেষ্টা করেও সেখানে পৌঁছাতে পারেননি। এ ঘটনায় মামলা করায় পুলিশ মোমিন হুজুরসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করলেও দু’দিন পর জেল থেকে তারা মুক্তি পায়। ঘটনার ভয়াবহতায় মানবাধিকার কর্মীসহ বিবিসির মানসী বড়–য়া, খুলনার সাংবাদিক মানিক সাহা, সাতক্ষীরার জনকণ্ঠের সাংবাদিক মিজানুর রহমানসহ অনেকেই ছুঁটে যান। পরবর্তীতে চাপের মুখে সম্পত্তি বাবদ স্বল্প টাকা ও ১০টি গাছ কেটে নিয়েই চিরদিনের জন্য তাদের ঘরবাড়ি ও জমি বেদখল হয়ে যায়। বর্তমানে তারা বিষ্ণুপুর ইউনিয়নে বসবাস করছেন। নির্ভীক সংবাদ প্রকাশের দায়ে জনকণ্ঠের সাংবাদিক মিজানুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশকের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করা হয়।

২০০৩ সালের জুলাই মাসে উপজেলার ডেমরাইল গ্রামে একটি মুসলিম নারীর সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের জের ধরে ভুগেন মন্ডলের ছেলে নিখিল মন্ডলকে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করিয়ে তাদের বিয়ে দেওয়া হয়। পরে তাদেরকে বাড়ি ও জমির অধিকার বুঝে না দেওয়ায় নরেন মন্ডল, সুমঙ্গল, নিশিকান্ত ও সুভাষ মন্ডলের বসতবাড়ি, রান্না ঘর ও গোয়ালঘর পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আবুল গাজী, আজিজ সরদার, গোলাম সরদারসহ দু’ শতাধিক উগ্র মৌলবাদি ও জামায়াত বিএনপি’র নেতা-কর্মৗরা ওই হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে অংশ নেয়। এ ঘটনায় নরেন মন্ডল বাদি হয়ে ৩৫ জনের নামে মামলা দিলেও পুলিশ প্রধান ১৬ আসামীকে বাদ দিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দেয়। এর বিরুদ্ধে না রাজির আবেদন খারিজ হলেও তা রিভিশন করলে জেলা ও দায়রা জজের নির্দেশে আমলী আদালত ঘটনার পূনঃ তদন্ত দিলেও দু’ মাস আগে একই ধরনের প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ফলে মূল আসামীরা আবারো রয়ে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। বাদি বিচার চাওয়ার মানসিকতাই হারিয়ে ফেলেছেন। আজো পর্যন্ত দোষীদের কোন বিচার না হওয়ার কারণ হিসেবে পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ বলে দাবি করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা।

২০০৩ সালে শ্যামনগর উপজেলার ভুরুলিয়া গ্রামের দেবেন মন্ডলের ছেলে মৃণাল মন্ডলকে নির্যাতন করে নৃশংসভাবে হত্যা করে জামায়াত শিবিরের নেতা কর্মীরা। পরে তাদের বেশ কিছু জমি দখলে নেওয়া হয়। তার লাশ বাড়ির উঠানে থাকা আম গাছে ঝুলিয়ে রেখে যাওয়ার সময় একজনকে আটক করলেও মামলা পরিচালনাকারি হিসেবে নিহতের এক সহোদর, তার মা ও বোনকে ২০১৪ সালে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে প্রতিপক্ষরা। ২০০২ সালের শেষের দিকে শ্যামনগরের হরিপুর মহাশ্মশান উচ্ছেদ করে সেখানে কৃষি মার্কেট তৈরির উদ্যোগ নেন স্থানীয় জামায়াতের টিকিটে নির্বাচিত সাংসদ গাজী নজরুল। তবে বিএনপি নেতা অ্যাড. ইফতেখার আলী ও সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের নেতা কর্মীদের আন্দোলনের মুখে নজরুল ইসলাম ও তার পক্ষের লোকজন পিছু হঠতে বাধ্য হন। ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী ২০০৫ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে ১০ জন হিন্দু নারীকে ধর্মান্তরিত করা হয়। মামলা তুলে না নেওয়ায় তাদেরকে পাল্টা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়।
২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আশাশুনি উপজেলার বদরতলায় ষাটোর্ধ এক বৃদ্ধা সংখ্যালঘু নারীকে গণধর্ষণ করা হয়। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় ঢাকা থেকে ছুঁটে আসেন বিশিষ্ঠ মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল।
২০০৬ সালের ৭ জুলাই ভোরে জেলা কৃষকদলের নেতা জুয়েল তালা উপজেলার খলিষখালি ইউনিয়নের দুধলিয়া হিন্দুপাড়ার পাশে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। পরদিন সাংসদ হাবিবুল ইসলাম হাবিবের সমর্থক বিএনপি নেতা কর্মীরা ওই গ্রামের দেবব্রত মন্ডল, নেপাল গাইন, সুভাষ সরকার, পরিতোষ সকারের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করে তাতে আগুন লাগিয়ে ভষ্মিভুত করে। এ ছাড়াও ওই পাড়ার আরো আটটি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। জুয়েল হত্যার ঘটনায় তার মা রোকেয়া বেগম বাদি হয়ে আটজন হিন্দুসহ ১০জনের নামে মামলা দেন। হত্যার ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে আফতাবউদ্দিন নামের এক ব্যক্তি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারেক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে তিনি ওই মামলার রাজসাক্ষী হয়েছে। অস্ত্র ও হত্যা মামলা দু’টি ভাগ হয়ে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতে বিচারাধীন (এসটিসি- ১৯৬/০৭ ও সেশন ১২৬/০৭) রয়েছে। ২০০৫ সালে তালার বালিয়াদহ গ্রামে প্রণব সরকারের সাড়ে চার একর জমি জবরদখল করে নেয় বিএনপি নেতা শাহাবাজ। কয়েক মাস আগে ওই জমির অর্ধেকাংশ দখল ফিরে পেলেও বাকীটা বেদখল রয়ে গেছে। এমনিভাবে সাতক্ষীরা সদর, দেবহাটা ও কলারোয়া উপজেলাতেও সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন হয়েছে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি মন্ডলীর সদস্য গোষ্ট বিহারী মন্ডল জানান, ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা, ডাকাতি, লুটপাট, ধর্মান্তরকরণ, মন্দির ভাঙচুর, জমি জবরদখল ও মিথ্যা মামলা খাওয়ার পর হিন্দু স¤প্রদায়ের অনেকেই দেশ ছেড়েছেন। সেই ধারা আজো অব্যহত আছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সংসদীয় নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন দলের নেতা কর্মীরা যেভাবে হিন্দু স¤প্রদায়ের বাড়ি ঘর, মন্দির, প্রতিমা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, চাঁদাবাজি করে পার পেয়ে যাচ্ছে তা কখনো ভাবা যায়নি। ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী ক্ষেত্র বিশেষ পুলিশ প্রশাসন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখায় তারা অন্ততঃ সান্তনা পেয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে প্রশাসনের ভুমিকায় সান্তনা পাওয়ার কিছু নেই। ফলে হিন্দুদের দেশত্যাগের প্রবণতা কমছে না।

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি। দৈনিক প্রজন্মের ভাবনা, দীপ্ত টেলিভিশন, দৈনিক বাংলা’৭১, উত্তরাধিকার ’৭১ নিউজ, সুনাম জেলা কমিটির সদস্য, এইচআরডিএফ ও মাইনরিটি এইচআরডিএফ সাতক্ষীরা জেলা কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ দলিত এন্ড মাইনরিটি মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সভাপতি।

Facebook Comments