সাতক্ষীরায় রাজনৈতিক দল সমুহের নির্বাচনী ইস্তেহার : দলিত ও সংখ্যালঘুদের জন্য প্রদেয় প্রতিশ্রতি কাগজে কলমে

 Posted on

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা :: ভোট আসে, ভোট চলে যায়। নির্বাচনী ইসতেহার থেকে যায় কাগজে কলমে। দলিত ও সংখ্যালঘুদের ভোট নেওয়ার জন্য নির্বাচনী ইস্তেহারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ছাড়াও বামদলগুলো চমকপ্রদ কথা উলে­খ করলেও ভোট পরবর্তীতে তা বাস্তবায়ন হয়না।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও জয় মহাপ্রভু সেবক সংঘের সভাপতি গোষ্ঠ বিহারী মণ্ডল বলেন, আইন ও শালিস কেন্দ্র, শারি, স্বদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, এইচআরডিএফ, মাইনরিটি এইচআরডিএফ, পরিত্রাণ, সুনাম, মাইনরিটিএইচআরডিএফ মিডিয়া ডিফেণ্ডার ফোরাম, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ পুজা উৎযাপন পরিষদ, দলিত ঐক্য পরিষদসহ বেশ কয়েকটি সংগঠণ সারা দেশের ন্যয় সাতক্ষীরা জেলাতে দলিত ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করে যাচ্ছে। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে সাথে সংবিধানকে কাটা ছেঁড়া করা হয়েছে কয়েকবার। ১৯৭২ সালে রচিত সংবিধানে বাংলাদেশকে অসা¤প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে উলে­খ করা হলেও জাতীয় পার্টির প্রধান হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের সময় সংবিধান কাটা ছেঁড়া করে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে উলে­খ করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে নবম সংসদীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইস্তেহারে উলে­খ করে যে দল ক্ষমতায় এলে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাবে। দলিত ও সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে। এরপর দু’টি সংসদীয় নির্বাচন চলে গেছে। ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে রয়ে গেছে। ভাঙা হচ্ছে মন্দির, প্রতিমা, শ্মশানঘাটসহ সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়। কৌশলে চলছে ধর্মান্তরিত করার কাজ। অর্পিত সম্পত্তির বড় অংশই ক্ষতাসীন আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের দখলে থাকায় আদালতের রায় পেয়েও সংখ্যালঘুনা দখল পাচ্ছেন না। জেলা প্রশাসক থেকে ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও প্রশ্নবিদ্ধ। প্রতিদিন জমি জবরদখলসহ বিভিন্ন ইস্যুতে হামলা চলছে সংখ্যালঘুদের উপর। অধিকাংশ হামলার ঘটনায় মামলা নিচ্ছে না পুলিশ। এসবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংগঠণ কাজ করলেও সংখ্যালঘুদের আঘাতের উপর মলম লাগানো ছাড়া চিরস্থায়ী প্রতিকার দেওয়া যাচ্ছে না। তাই অনেকে দেশ ত্যাগ করে যান মাল রক্ষা করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
গোষ্ঠ বিহারী মণ্ডল আরো বলেন, সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের ধীরেন্দ্রনাথ হাজরার জমি জাল দলিলের মাধ্যমে সাড়ে সাত বিঘা জমি দখল করে রাখতে ইয়াকুব মোড়লের ছেলে রবিউল, রফিকুল ও শফিকুলসহ ভারতীয় রিফিউজিরা একের পর এক স্ত্রী স্বর্ণলতা হাজরা ও তার ছেলেদের উপর হামলা ও মামলা করেছেন। মামলা দিয়ে ছোট ছেলে পরিতোষকে দেশত্যাগে ব্যাধ্য করেছেন। মেঝ ছেলে মহিতোষকে হত্যা, অপহরণ ডাকাতিসহ ১৮টি মামলায় জড়িয়ে দীর্ঘদিন জেল খাটিয়েছে। এসব মামলায় তাকে আইনি সহায়তা দিতে মা স্বর্ণলতা হাজরা, বোন ছন্দাকে রাস্তায় রাস্তায় কাটাতে হয়েছে। সর্বোপরি ২০১৪ সালের ২৬ আগষ্ট সাতক্ষীরা জেলগেট থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার সময় ডিবি পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে ক্রাসফায়ারে দেওয়ার চেষ্টা করে। আইন ও শালিস কেন্দ্র, শারীর স্থানীয় প্রতিনিধি, স্বদেশ, এইচআরডিএফ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদ ও বাংলাদেশ পুজা উদযাপন পরিষদ ও কয়েকজন সাংবাদিকের সাতদিনব্যাপি রাত দিনের প্রচেষ্টায় তাকে ক্রসফায়ারের হাত থেকে জীবনে বাঁচানো সম্ভব হলেও একটি ডাকাতি চেষ্টার মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানো হয়। বর্তমানে ওই মামলা আদালতে বিচারাধীন। স্থানীয়দের নিয়ে মাপ জরিপ করে জমির সীমানা নির্ধারণ করা হলেও রাতের আঁধারে সীমানা পিলার তুলে দিয়ে আংশিক জমি বেদখল করা হয়েছে। মহিতোষকে বাঁচাতে যে দু’ পুলিশ সদস্য নির্যাতিতের পরিবার ও মানবাধিকার কর্মীদের সহায়তা করেছিল তাদের একজনকে ফেনসিডিল মামলা দিয়ে জেলে পাঠানোর পাশপাশি বিভাগীয় মামলা দিয়ে সাসপেন্ড করা হয়। সাসপেণ্ড হওয়া দু’ পুলিশ সদস্য চাকুরি ফিরে পাননি।
একইভাবে একই গ্রামের হরিপদ দাসের পৈতৃক সম্পত্তি রিফিউজি নুরসিলাম জাল জালিয়াতির মাধ্যমে দখল করে হামলা ও মামলা দিয়ে ওই পরিবারকে নিঃস্ব করে ফেললেও পরবর্তীতে শারী ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দের সহায়তায় এখনো ওই পরিবারটি বিরোধপূর্ণ জমিতে বসবাস করতে পারছেন। শ্যামনগরের ভুরুলিয়ায় জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে দেবেন মণ্ডলের ছেলেকে হত্যা করে লাশ বাড়ির উঠানে ঝুলিয়ে রাখা ও পরবর্তীতে মামলার তব্দিরকারক অপর ভাইকে হত্যা করতে এসে মা ও বোনকে একইসাথে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টার ঘটনা শারীর স্থানীয় প্রতিনিধিসহ অনেকেই কঠোর হস্তেক প্রতিহত করেছেন। শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জের বাঘ বিধাবর মেয়ে রুপালী ধর্ষণ ও হত্যা, সদরের আখড়াখেলায় সাধুখাঁ পরিবারের জমি জালিয়াতির মাধ্যমে দখলে রাখতে সন্ত্রাসী আলাউদ্দিনের হামলা, মামলা, দেবহাটার দক্ষিণ পারুলিয়ায় তপন বিশ্বাসের জায়গা নেপথ্যে থেকে কুখ্যাত পাচারকারি নুর আমিন ও তার সহযোগীদের জবরদখলকৃত জমি উদ্ধারে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদ, পুজা উদযাপন পরিষদ, শারী ও মানবাধিকার কর্মীরা বিশেষ ভুমিকা রাখে। এরপরও শ্যামনগরের নকীপুরে গীতা ও ভাগবত পাঠের আলোচনা সভায় সন্ত্রাসী হামলা, কৈখালিতে সরস্বতী পুজার অনুষ্ঠানে হামলা, আশাশুনির কচুয়ায় হিন্দুদের উপর হামলা চারিয়ে দুর্গা প্রতিমা ভাঙচুর, প্রতাপনগরে দুর্গা প্রতিমা ভাঙচুর, দেবহাটার পুটিমারিতে কালিপ্রতিমা ভাঙচুর করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা, সদরের বাবুলিয়ায় দুর্গা প্রতিমা ভাঙচুরসহ বিভিন্ন ইস্যুতে উপরোক্ত সংগঠণগুলোর ভুমিকার কারণে মামলা হয়েছে। আসামীরা গ্রেপ্তার হলেও দীর্ঘ সময়ে বিচার শেষ হয়নি।

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি। দৈনিক প্রজন্মের ভাবনা, দীপ্ত টেলিভিশন,দৈনিক বাংলা’৭১, উত্তরাধিকার ’৭১ নিউজ, সুনাম জেলা কমিটির সদস্য, এইচআরডিএফ ও মাইনরিটি এইচআরডিএফ সাতক্ষীরা জেলা কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ দলিত এণ্ড মাইনরিটি মিডিয়া ডিফেণ্ডার ফোরামের সদস্য, কার্যনির্বাহী সদস্য দলিত ডেভলপমেন্ট এলায়েন্স ইন বাংলাদেশ (ডিডিএবি)।

Facebook Comments