সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কুটির শিল্পে ব্যাপক অবদান রাখতে পারে ঠাকুরগাঁওয়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী

 Posted on

ফারজানা আক্তার পাখী :: ঠাকুরগাঁও বাংলাদেশের উত্তর জনপদের একটি জেলা। এ জেলায় গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পে বরাবরই অবদান রাখছে সংখ্যালঘু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। লোকজ সংস্কৃতি বাঙ্গালী সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলার প্রথিতযশা লেখক, সাহিত্যিকদের গল্প, কাব্য, কবিতা ও উপন্যাস পাঠ করলে লোকজ সংস্কৃতির হাজার বছরের ইতিহাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায় গ্রাম-বাংলার কুটির শিল্প বাঙ্গালী সংস্কৃতির সংগে কতটা নিবিড়ভাবে মিশে আছে। উদাহরণ হিসেবে আমি মাটির তৈরি কুপির কথা বলতে চাই। এমন এক সময় ছিল যখন মাটির তৈরি কেরোসিন নির্ভর এই কুপিই ছিল গ্রাম-বাংলার আপামর জনতার আঁধার রাতের আলোর প্রধান উৎস। ধনী, গরীব নির্বিশেষে সকলেই মাটির তৈরি কুপি ব্যবহার করত। কালের আবর্তে হারিকেন, হ্যাচাক, বিদ্যুৎ, সোলার, আইপিএস ইত্যাদির ধারাবাহিক আবর্তনের ফলে এক সময়ের অতি প্রয়োজনীয় বস্তু মাটির তৈরি কুপি এখন যাদুঘরে। সরেজমিনে গ্রাম-বাংলার ঘরে ঘরে মাটির তৈরী কুপির সন্ধানে নামলে শতকরা ২ ভাগ পরিবারে এই বস্তু‘টি পাওয়া যাবে কি-না তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে দিন দিন চাহিদা কমছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের। সেই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে কুটির শিল্প। সঙ্গত কারণেই এই শিল্পের সাথে জড়িত শিল্পীরা জীবন-ধারনের তাগিদে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। আর এটাই হচ্ছে স্বাভাবিক নিয়ম।

গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পের মধ্যে অন্যতম হলো মাটির তৈরি তৈজসপত্র ও খেলনা সামগ্রী, বাঁশ ও বেতের তৈরী আসবাবপত্র, পাটের তৈরি বিভিন্ন উপকরণ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখয্যোগ্য। কুটির শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কমে গেলেও এখনও শেষ হয়ে যায়নি। গ্রাম-গঞ্জে আয়োজিত স্বল্প-মেয়াদি ও মধ্য-মেয়াদি মেলায় কুটির শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের সমাগম ও বিক্রয় এখনও চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে গ্রামীণ মেলায় এখনও কুটির শিল্পে উৎপাদিত পণ্য ক্রয়ের জন্য ক্রেতারা ভিড় করে থাকেন। এ সকল ক্রেতা কেউ পারিবারিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য আবার কেউ শখের উপকরণ হিসেবে কুটির শিল্পের উৎপাদিত পণ্য ক্রয় করে থাকেন। অন্যদিকে ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনা করে কিছু কিছু কুটির শিল্পী ক্রেতাদের জন্য আকর্ষনীয় জিনিস তৈরি করছেন। যেমন-মাটির তৈরি বিভিন্ন উপকরণ। দাম সহনীয় মাত্রায় হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নারীরা এ সকল মাটির তৈরি নিত্য প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনেন শখের বশবর্তী হয়ে।

তবে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, কুটির শিল্পের সংগে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের মানুষের সম্পৃক্ততাই বেশি। যুগ যুগ ধরে এ সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠি কুটির শিল্পের সংগে সম্পৃক্ত ছিল এবং এখনও রয়েছে। অনেকেই জীবনের তাগিদে পেশা পরিবর্তন করলেও সকলের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি। তাই এখনও কুটির শিল্প আমাদের বাঙ্গালী সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে স্ব-মহিমায় উদ্ভাসিত। বিকল্প কাজের দক্ষতা না থাকায় যে সকল কুটির শিল্পী পেশা পরিবর্তন করতে পারেনি তাঁরা বাপ-দাদার পৈতৃক পেশা আঁকড়ে ধরে অতিকষ্টে জীবন-যাপন করছে।

বাংলাদেশে বসবাসরত প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মধ্যে দলিতরা অন্যতম। দলিতদের মধ্যে আবার সুইপাররা অন্যতম। জাত সুইপারের পরিবর্তে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন স¤প্রদায়ের মানুষকে সুইপার হিসেবে নিয়োগ প্রদান এবং আধুনিক পদ্ধতিতে গৃহ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণের ফলে সুইপাররা আজ কঠিন সমস্যার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। তিন বেলা খেঁয়ে পরে বেঁচে থাকা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুইপারদের জনসংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেলেও কাজের ক্ষেত্র হৃাস পাওয়ায় তাদের এই সংকট চরম আকার ধারন করেছে। এছাড়া দলিত শ্রেণীভুক্ত ঋষি, ডোম, রবিদাসসহ অন্য স¤প্রদায়ের মানুষরা নানা সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।

গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলি প্রান্তিক মানুষ বিশেষ করে দলিত ও সংখ্যালঘু মানুষের অংশগ্রহণে মুখরিত হয়ে ওঠে। উৎসবে কুটির শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের ক্রেতা ও বিক্রেতার সিংহভাগই সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের মানুষ। বাংলাদেশে দলিত স¤প্রদায়ের মানুষকে চলমান সংকট থেকে মুক্ত করার জন্য আধুনিক মানের কুটির শিল্পে পণ্য উৎপাদনে তাদের নিয়োজিত করা যেতে পারে। এতে ঐতিহ্যবাহী পেশার পাশাপাশি তাদের পরিবারে বিকল্প আয়ের পথ সৃষ্টি হবে এবং স্বাচ্ছন্দ্যপুর্ণভাবে জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধিত হবে। এ লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি ভাবে দলিতদের জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে এবং বিনাসুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। দলিতদের সংগে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদের চাহিদা অনুযায়ী কুটির শিল্প নির্বাচনের সুযোগ প্রদান করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী এককভাবে বা দলীয়ভাবে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। দলিতদের উদ্যোগে স্থাপিত কুটির শিল্পের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মেলার আয়োজন করতে হবে এবং এর মাধ্যমে কুটির শিল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। দলিতদের উৎপাদিত কুটির শিল্পের পণ্য বাজারজাতকরণ এবং ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বাজারে বিক্রেতা হিসেবে দলিতদের অভিগম্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

আমি পুর্বেই উলে­খ করেছি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলিতে দলিতসহ অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রণ থাকে চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এ সকল জনগোষ্ঠির মানুষ কোনো লাইম লাইটে থাকে না। নিরবে-নিভৃতে এ সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠি বাঙ্গালী উৎসবগুলি পালন করে থাকে। কোনো লোক-দেখানো রাখঢাক নয়, বরং সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিজস্ব সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই সকল বাঙ্গালী উৎসবে তাঁরা অংশগ্রহণ করে এবং পালন করে থাকে। যা আমাদের মুলধারার মানুষের অন্তরালেই রয়ে যায়। শত শত বছর ধরে যে সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠি বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রেখেছে তাদের পেছনে রেখে বাঙ্গালী উৎসবের আয়োজন উলুবনে মুক্ত ছড়ানো ছাড়া আর কিছুই নয়। সত্যিকার অর্থে বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্য ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির অন্যতম লালনকারী এ সকল প্রান্তিক মানুষকে সামনে তুলে নিয়ে এসে হাইলাইটস করতে হবে। এজন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, উৎসবের আয়োজন হতে হবে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির নিজস্ব সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে অক্ষুন্ন রেখেই।

মোছাঃ ফারজানা আক্তার পাখী, যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ দলিত এন্ড মাইনোরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেল্ডার ফোরাম।

Facebook Comments