মুক্তিযুদ্ধে পাটুয়াপাড়ার শহীদ সন্তানেরা

 Posted on


আজহারুল আজাদ জুয়েল ::
বাংলাদেশের সুমহান স্বাধীনতা যুদ্ধে দিনাজপুর জেলা শহরের পাটুয়াপাড়া মহল্লার প্রায় সকল মানুষের কম-বেশি অংশগ্রহণ ছিল। বিশেষ করে যুব শ্রেণীর সবাই তখন ঐ জনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এলাকার লোকজনের সাথে আলাপ করে জানা যায় যে, হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথমবারের মত পাটুয়াপাড়ায় হামলা, গুলি ও অগ্নি সংযোগ করেছিল। এই পাড়ার ২নং জামে মসজিদ সংলগ্ন একটি টেলিফোন পোলে এখনো সেদিনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্ন রয়ে গেছে।

সেই দিন হানাদারদের আগমন ঠেকাতে পাড়ার যুবকেরা পাটুয়াপাড়া ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন গীরিজা ক্যানেলের ব্রিজটি ভেঙে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ব্রিজ ভাঙার কাজ শুরুর মুহূর্তে হানাদার বাহিনী সেখানে চলে আসে এবং গুলি বর্ষণ করে। সৌভাগ্য বশত ঐ গুলি কাউকে লাগে নাই।

গুলিবর্ষণ কালে সেদিন ২০-২২ জন যুবক ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন মৃত আজিজুলের (খসড়া আজিজুল নামে পরিচিত) বাড়িতে লুকিয়ে প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। যুবকদের লুকিয়ে থাকার বিষয়টি হানাদার বাহিনী টের পায় নাই। টের পেলেই মহা সর্বনাশ হতো। যুবকদের সবাইকে হয়ত লাশ হতে হতো।
পাকিস্তানি সেনারা সেদিন সফিউদ্দীন আহমেদ ওরফে সফি লাঠিয়ালের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। পুরো বাড়ির সাথে দুইটি গরুও পুড়ে মারা গিয়েছিল ঐ আগুনে। পাটুয়াপাড়া জাগরণী ক্লাবেও সেদিন আগুন লাগানো হয়েছিল। তখন এই ক্লাবের অবস্থান ছিল পাটুয়াপাড়া-লালবাগ রাস্তার পাশে। তবে সৌভাগ্যবশত সেইদিন কেউ নিহত ও আহত হয় নাই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে পাটুয়াপাড়ার বেশ ক’জন শহীদ হয়েছেন। এই নিবন্ধে সেই শহীদদের পরিচিতি তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো;

শহীদ ইসমাইল হোসেন পল্টু : মো. ইসমাইল হোসেন পল্টু ছিলেন পাটুয়াপাড়া জাগরণী ক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে প্রতিরোধ যুদ্ধে ব্যাপক ভূমিকাও রেখেছিলেন। একজন সামাজিক কর্মীও ছিলেন তিনি। জাগরণী ক্লাব মাঠে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের পিটি করাতেন। ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে কি যাচ্ছে না, বাড়ি বাড়ি গিয়ে তার খবর নিতেন এবং ছেলে-মেয়েদের স্কুলে যেতে অনুপ্রাণিত করতেন। তিনি বি.কম পাশ করেছিলেন এবং নিজেও ছাত্র-ছাত্রী পড়াতেন।

দিনাজপুর শহর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দখলে আসার পর ইসমাইল হোসেন পল্টু পরিবার নিয়ে মাঝাডাঙ্গার মালঝাড় এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। হানাদার বাহিনী সেখান থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ জুন তাকে ধরে নিয়ে যায়। তার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা পন্থী শিক্ষক হিসেবে কাজ করার অভিযোগ এনে জেলখানায় ঢুকানো হয়। জেলে ঢুকানোর দু-একদিন পরেই তার লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য জেল কর্তৃপক্ষ খবর পাঠায়। পাটুয়াপাড়ার শামসুল আলম জানান, পল্টু ভাইকে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়েছিল। তার গায়ে আগুনের ছেঁকা দেয়া হয়েছিল। পাটুয়াপাড়ার মীর মাসুদ জানান, পল্টুকে জেলখানায় নিয়ে যাওয়ার পর বাঁশ দিয়ে পিটানো হয়েছিল। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

ইসমাইল হোসেন পল্টুর মৃত্যুর খবর পেয়ে জেলখানা থেকে তার লাশ নিয়ে আসেন দিনাজপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক পাটুয়াপাড়া নিবাসী মো. আবু জোবায়ের। তিনি শহীদ পল্টুর মামাত ভাই ছিলেন। তিনি বলেন, তার লাশ আনার জন্য কেউ সাহস পাচ্ছিল না। তাই আমিই সাহস করে জেলখানায় গিয়ে লাশ নিয়ে আসি এবং জানাজা শেষে লালবাগ গোরস্থানে দাফন করি। তাকে নির্মম ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছিল এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত।
ইসমাইল হোসেন পল্টুর স্ত্রী লুৎফন নেছা ফজি, মেয়ে ইয়াসমিন বেগম লাকি ও ছেলে শাহিনুর আলম এখনো বেঁচে আছেন। কিন্তু শহীদ পরিবার হিসেবে তারা কোন সরকারি অনুদান পাচ্ছেন না। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পুত্র শাহিনুর আলম। বলেন, স্বাধীনতার জন্য বাবা জীবন দিলেন। তাঁর ¯েœœহ থেকে বঞ্চিত হলাম। রাষ্ট্র থেকেও বঞ্চিত হচ্ছি।

শহীদ নহরউদ্দীন : যেমন ইয়াকুব হাজী ও বারেক-খালেকের পিতা নহরউদ্দিন বুড়া পুনর্ভবা নদী পেরিয়ে বিরলে যাওয়ার পথে হত্যার শিকার হয়েছিলেন।

পাটুয়াপাড়ার গিরীজানাথ ক্যানেলের পাশে বাড়ি শহীদ নহরউদ্দীন আহমেদের, পিতা-শেখ দেশামতৌলা। ডাক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারি ছিলেন নহরউদ্দীন। পাটুয়াপাড়ায় পরিচিতি ছিল নহর পিয়ন হিসেবে।
নহরউদ্দীনের দুই স্ত্রীর একজন কবিরন নেছা। তিনি মারা যাওয়ার পর দ্বিতীয় স্ত্রী বাছিরন নেছাকে বিয়ে করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই পক্ষের সন্তানদের মধ্যে ছিলেন ইয়াকুব আলী, আব্দুল বারেক, আব্দুল খালেক, আব্দুল মালেক, দোলন বেগম ও পারুল বেগম।

শহীদ নহরউদ্দীনের বড় ছেলে আলহাজ¦ ইয়াকুব আলী (৮০) মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই ডাক বিভাগের চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলা ডাক বিভাগে কর্মরত ছিলেন এবং সেখানেই অবস্থান করছিলেন।

তিনি বলেন, দিনাজপুর শহরের পরিস্থিতি খারাপ, এমন খবর পেয়ে আমি লোক মারফত খবর পাঠিয়ে বলেছিলাম যে, তারা সবাই যেন, পীরগঞ্জে চলে আসে। কিন্তু তখন তো যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার মতো এত সহজ ছিল না। তখনকার প্রেক্ষাপটে পীরগঞ্জ ছিল অনেক দূর। আমার বাবা, মা ভাই-বোনেরা কাঞ্চন এলাকা দিয়ে পুনর্ভবা নদী পার হয়ে বিরলের দিকে যাচ্ছিল। যাওয়ার পথে আমার বাবাকে নদীর উপর গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে শুনেছি। তবে আমরা তার লাশ পাই নি।

শহীদের দ্বিতীয় সন্তান আব্দুল বারেক (৭৪) জানান, আব্বার বয়স প্রায় ৬৫ হতে ৭০ এর মতো ছিল। কিন্তু তিনি স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারতেন। যুদ্ধ পরিস্থিতি খারাপ হলে তিনি আমাদেরকে বলেন, তোমরা আগাও আমি যাচ্ছি। তখন আমি মা ও ভাই-বোনদের নিয়ে কাঞ্চন নদী পার হয়ে বিরলের দিকে যাই এবং পরে ইন্ডিয়া চলে যাই। পরে লোকমুখে জানতে পারি যে, আমার বাবাকে কাঞ্চনে পাকিস্তানি সেনারা গুলি করে মেরেছে। আমরা তার লাশের সন্ধান আজও পাইনি। সরকারি সাহায্য-সহযোগিতাও কখনো পাইনি। বাবা ডাক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ছিলেন। সেখান থেকেও কিছু পাইনি।

শহীদ সাহাবুদ্দীন : পাটুয়াপাড়ার অতি পরিচিত মুখ ছিলেন মরহুম সজীবউদ্দীন আহম্মেদ এর পুত্র মোঃ রিয়াজউদ্ধীন আহম্মেদ ওরফে সাহাবুদ্দীন। তিনি রেশনের ডিলার ছিলেন বিধায় ‘শাহাবুদ্দিন ডিলার’ হিসেবে বেশি পরিচিত ছিলেন। প্রকৃত পক্ষে তিনি ছিলেন একজন বড় ব্যবসায়ী ও আমদানীকারক। এছাড়া ঠিকাদারীও করতেন। বিভিন্ন ধরনের ভোজ্য পণ্য আমদানী করে পাইকারি বিক্রি করতেন। চাউল, আট, তেল, ডালডা, লবন, চিনি, কেরোসিন রেশনি দরে বিক্রি করতেন। ইন্ডিয়া থেকে কয়লা আমদানী ও বিক্রি করতেন বলে জানা যায়।

শহীদ সাহাবুদ্দীন
শহীদ সাহাবুদ্দীন

শরীর-স্বাস্থ্যে মোটা ও স্বাস্থ্যবান ছিলেন শাহাবুদ্দিন ডিলার। রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না, তবে সামাজিক কাজে অবদান রাখার চেষ্টা করেছেন। দিনাজপুর লোকভবন যা এক সময় ট্উান হল নামে পরিচিতি লাভ করেছিল, সেটি প্রতিষ্ঠায় বড় অংকের চাঁদা দিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কাঞ্চন এলাকা দিয়ে পুনর্ভবা নদীর পার হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নদী পার হওয়ার আগেই তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। কাঞ্চনে থাকা পানির ট্যাংকির উপরে তখন পাকিস্তানি সেনারা থাকত। সেখান থেকেই তাকে গুলি করা হয়েছিল বলে জানান শহীদে নাতি এমরান হোসেন রিজভী। তিনি তার পিতা মো. হোসেন মুকুল ও দাদী হুসনে আরার কাছ থেকে শোনা কথায় জানান যে, দাদু বিরলের দিকে যেতে চেয়েছিলেন। কাঞ্চনের পানির ট্যাংকি পার হয়ে পুনর্ভবা নদীর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়ই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। দাদুর কোমরে তখন লাইসেন্স করা বন্দুক ও প্রচুর টাকা ছিল। কিন্তু সেগুলো পরে পাওয়া যায় নাই। তাঁর লাশেরও সন্ধান পাওয়া যায় নাই।

মৃত্যুকালে শহীদ রিয়াজউদ্ধীন আহম্মেদ ওরফে সাহাবুদ্দীন ডিলারের ৩ পুত্র ও ৪ কন্যা সন্তান ছিল। পুত্র সন্তানদের নাম মোহাম্মদ হোসেন মুকুল, মোহাম্মদ রতন ও রেজওয়ান হোসেন রুবেল। কন্যা সন্তানদের নাম মোছা. আলো, রওশন আরা, দৌলতন নেছা দোলো ও বুলনী। উল্লিখিত পুত্র কন্যাদের মধ্যে রুবেল ও দোলো ব্যতীত অন্য পুত্র-কন্যাদের স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে সবাই মৃত্যুবরণ করেছেন। পুত্র-কন্যাদের মধ্যে মো. হোসেন মুকুল দিনাজপুর শহরের পরিচিত মুখ ছিলেন। তিনি জাতীয় পার্টির রাজনীতি করতেন। শহীদ সাহাবুদ্দীনের স্ত্রী হুসনে আরা স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন।
শহীদের নাতি এমরান হোসেন রিজভী (৪০) জানান, মৃতুকালে শহীদ সাহবুদ্দীনের বয়স হয়েছিল ৬০-৬৫ বছরের মতো। তিনি দেশের জন্য মারা গেলেও কখনো কোন সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়া যায় নাই।

শহীদ সামিরুদ্দিন : পাটুয়াপাড়ার মৃত জরিবউদ্দীন আহমেদ ও সবেদা খাতনের পুত্র শহীদ সামিরউদ্দীন ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন। মহারাজা স্কুল ট্রানজিট ক্যাম্পে অস্ত্র জমা দিয়ে ক্যাম্পেই অবস্থান করছিলেন। কিন্তু ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি ট্রানজিট ক্যাম্পে সংঘটিত ভয়াবহ বিস্ফোরণে শহীদ হন বীর মুৃক্তিযোদ্ধা সামিরুদ্দীন। পাটুয়াপাড়ার প্রবীণ শিক্ষক আবু জোবায়ের জানান, সামিরউদ্দীন তার ভাগ্নে হতেন। মহারাজা স্কুলে সংঘটিত বিস্ফোরণের পর তার কোন সন্ধান পাওয়া যায় নাই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শহীদ সামিরউদ্দীনের বাড়ি ছিল পাটুয়াপাড়া ১ নম্বর জামে মসজিদের পাশে, শিক্ষক আবু জোবায়েরের বাড়ির সামনে।

শহীদ আব্দুল জলিল : পাটুয়াপাড়ার প্রখ্যাত শিক্ষক আলহাজ¦ আবু জোবায়ের ওরফে জবেদ মাষ্টারের সহদোর ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আব্দুল জলিল। তিনি প্রায় সকল কথায় লোককে খোঁচা দিতেন। এই কারণে ‘খোঁচা জলিল’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীনও ছিলেন।

শহীদ আব্দুল জলিলের পিতা মো. তফিরউদ্দীন আহমেদ, মায়ের নাম জািমলা খাতুন। তফিরউদ্দীন আহমেদ রেল বাজারে ডালের পাইকারি ব্যবসা করতেন। জলিল নিজে ছিলেন ক্ষুদে ব্যবসায়ী। তিনি এক সন্তানের জনক ছিলেন। তবে স্ত্রী সন্তান এখন বেঁচে নেই। তিনি কোথায় কিভাবে মারা গেছেন তা সঠিকভাবে জানা নেই কারো।

শহীদ জলিলের ছোট ভাই জেলা স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক আলহাজ¦ আবু জোবায়ের বলেন, আব্দুল জলিল মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায়ই ইন্ডিয়া যাতায়াত করতেন। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে জানতে পারি যে, তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কারা হত্যা করেছে সঠিকভাবে জানা নেই। তবে রাজাকাররা হত্যা করেছে এটা জেনেছি। রাজাকার বাহিনী লুটতরাজ চালানোর সময় জলিলের মতো অনেককে হত্যা করেছে বলে আমি শুনেছি। আমার জানামতে জলিলকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
পাটুয়াপাড়ার আয়কর আইনজীবী রেজাউল ইসলাম, পিতা- মৃত আহসানউদ্দীন আহমেদ, মাতা-মৃত সবেদা খাতুন জানান, আব্দুল জলিলকে রাধিকাপুর সীমান্তের ভারতীয়রাই কোদাল দ্বারা চটিয়ে হত্যা করেছে। তাকে হত্যার দৃশ্য আমি নিজেই দেখেছি। ভারতীয়রা তাঁকে পাকিস্তানী চর সন্দেহে হত্যা করেছিল।

শহীদ শামসুল আজম বাবু : পাটুয়াপাড়ার শহীদ শামসুল আজম বাবু হলেন বর্তমান গনেশতলাস্থ সান ষ্টুডিওর মালিক মো. রবিউল ইসলাম রবির বড় ভাই। তার পিতার নাম ইসলামউদ্দীন আহমেদ মিঠু, মায়ের নাম বেগম শামসুন নেহার।

শামসুল বাংলা স্কুলে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিলেন। তার মধ্যে অস্থির ভাব ছিল এবং পালানো স্বভাব ছিল। মুক্তিযুদ্ধের বছর তিনেক আগে তিনি ঢাকায় পালিয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠনে চাকুরি নিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক ঢাকায় ব্যাপক গণহত্যা সংঘটিত হলে দিনাজপুরে ফিরে আসার জন্য তিনি অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু কোনভাবেই ফিরে আসতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে ঢাকায় কর্মরত আপন চাচা সেরাজউদ্দীন আহমেদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন এই ভেবে যে, তারা একসাথে দিনাজপুরে ফিরে আসবেন। সেরাজউদ্দীন ঢাকায় ডাক বিভাগের গাড়ি চালক ছিলেন। কিন্তু তখনকার রক্তাক্ত ও উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে নিজের চাচার কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন শামসুল আজম। পরিস্থিতি তখন এমন ভয়াবহ যে, তিনি ঢাকার যেখানে থাকতেন সেখানেও ফিরতে পারছিলেন না। এমতাবস্থায় খুলনায় যাবেন এমন এক ব্যক্তির সাথে পরিচয় হয় শামসুলের। তিনি তার সাথেই কেমন করে যেন খুলনায় চলে যান। সেখানে শামসুলের এক পিতৃবন্ধু ছিলেন যার নাম নুনু। শামসুল নুনুর বাসায় ১৫-১৬ দিন থাকেন। এরপর ট্রেনযোগে দিনাজপুরের উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু ট্রেনটি সান্তাহার এসে থেমে যায় এবং সেখানেই সকল যাত্রীকে নামিয়ে দেয়। এরপর শামসুলের কোন সংবাদ আর পাওয়া যায় নাই। রবিউল ইসলাম রবি বলেন, এইটুকু জানি যে, সান্তাহার ছিল বিহারিদের ক্যান্টনমেন্ট। সেখানে হাজার হাজার বাঙালিকে বিহারিরা জবাই করেছে। অনুমান করি যে, বড় ভাই শামসুলকে সেখানেই জবাই করে হত্যা করা হয়েছে।

শহীদ হবিবর রহমান ওরফে বল্টু সলিম : পাটুয়াপাড়া জাগরণী ক্লাবের পাশে থাকতেন মো. সলিমউদ্দীন। লম্বায় কম হওয়ার কারণে ‘বল্টু সলিম’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর একমাত্র পুত্র হবিবর রহমান, যিনি ছিলেন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাকেও বিহারিরা পিটিয়ে হত্যা করেছে। তবে তাকে কোথায় হত্যা করা হয়েছে কেউ তা বলতে পারেন নাই।

শহীদ হবিবর রহমানের মা-বাবা এখন বেঁচে নেই। তার কয়েকজন বোন আছে। কিন্তু বোনদের সবাই মানসিক ভারসাম্যহীনতার শিকার।

শহীদ মকবুল হোসেন : পাটুয়াপাড়া ছয় রাস্তা মোড়ের রেজিয়া সোপ ফ্যাক্টরীর প্রতিষ্ঠাতা নাজিরউদ্দিন আহমেদের পুত্র মকবুল হোসেনকে হত্যা করা হয়েছিল ঘাসিপাড়া বটতলা মোড় সংলগ্ন একটি গলির ভিতরে। তাকে ধারালো অস্ত্রের খোঁচা মারা ও জবাই করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

শহীদ মকবুলের পুত্র বর্তমানে মালদহপট্টি নিবাসী মো. রবিউল ইসলাম বাবু’ জানান. পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৪ এপ্রিল দিনাজপুর শহরে প্রবেশ করলে তার পিতা মকবুল হোসেন, মাতা রওশন আরা বেগম, দাদা হাজী নাজিরউদ্দীনসহ পরিবারের সবাই বিরল উপজেলার ফরক্কাবাদ এলাকায় নানা সাহিদ আহমেদের বাড়ি যান। তবে যাওয়ার সময় চাচা মনসুর আলীকে নিয়ে যেতে পারেন নাই। কারণ ঐদিন তিনি মানুষকে পিটিয়ে মারার দৃশ্য দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি রক্ত বমি করছিলেন এবং গরুর গাড়ীতে তুলতে গেলেই চেতনা হারিয়ে ফেলছিলেন। তখন তাকে ও দুই দাদী তহমিনা বেগম এবং কুলসুম বেগমকে রেখে পরিবারের অন্য সদস্যরা দুপুর বেলা ফরক্কাবাদে রওনা দেন। সবাইকে নানার বাড়ি রেখে তিনি আবার ফিরে আসেন ও রাত ১০টার দিকে দুই দাদীসহ চাচা মনসুর আলীকে নিয়ে আবারো ফরক্কাবাদে যান।

সেদিন ফরক্কাবাদে পালিয়ে যাওয়ার সময় বাড়ি থেকে কোন কিছু নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নাই। তাই সপ্তাহখানেক পর হাজী নাজিরউদ্দীন আহমেদ তার ছেলেদের বলেন, তোমরা কেউ বাড়িতে যাও, বাড়ি-ঘরগুলো দেখে আসো, আর কোন কিছু নিয়ে আসা যায় কি না দেখ।

নাজিরউদ্দীনের কথায় পুত্র মকবুল হোসেন, মনসুর আলীর ছেলে ফড়িং ও রেজিয়া সোপ ফ্যাক্টরীর তৎকালিন ম্যানেজার আফজাল হোসেনকে নিয়ে পাটুয়াপাড়ার বাড়িতে ঢুকেন। কিন্তু বিহারিরা টের পেয়ে পুরো বাড়ি ঘেরাও করে। ঘেরাও অবস্থা হতে ফরিং পালিয়ে যেতে পারলেও মকবুল ও আফজাল ধরা পড়েন। তাদেরেকে রশি দিয়ে বেঁধে বর্তমান ঘাসিপাড়া বটতলা মোড় সংলগ্ন একটি গলির ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিহারি মহিলাররা তাদেরকে দেখিয়ে বলতে থাকে যে, ‘ইয়ে আদমী হামারা সাহরকে মার দিয়া।’ এ কথা বলার সাথে সাতে তাদের উপর বেদম নির্যাতন চালানো হয়। এরপর তাদেরকে তৎকালীন রায় সাহেব বাটির (বর্তমান আদর্শ কলেজ) ভিতরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করার পূর্ব মুহূর্তে আফজাল হোসেন আকস্মিক দৌড় দিয়ে কিভাবে যেন পালিয়ে যেতে সমর্থ হন। কিন্তু মকবুল হোসেনের সেই সৌভাগ্য হয় নাই। অবাঙালিরা তাকে নিষ্ঠুরভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে, এর সাথে বাঁশের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। তিনি ২৫ এপ্রিল ধরা পড়েছিলেন এবং ঐদিনেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল বলে জানা যায়। তার লাশ রায় সাহেব বাটির একটি গর্তে ফেলে রাখা হয়েছিল। স্বজনরা তার লাশ পায়নি। শহীদের নামে মালদহপাট্টিতে একটি মার্কেটের নাম রাখা হয়েছে ‘মকবুল মার্কেট’।

শফিউদ্দীন শফি : ২৫ বছরের টগবগে যুবক ছিলেন শফিউদ্দীন শফি। বাড়ি পাটুয়াপাড়ার গিরীজানাথ ক্যানেলের পাশে। তার মাতা তুড়িবুড়ি নামে পরিচিত ছিলেন। বর্তমান পুনর্ভবা সেতু (মুক্তিযুদ্ধকালে কাঞ্চন সেতু) ও খোসালডাঙ্গী হাটের মাঝামাঝি স্থানে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মুদিপাড়ার সাবুল জানান, শফি ও পাটুয়াপাড়ার জনৈক শুকুরুর বাসায় ভাড়া থাকা কাসেমের পিতাসহ ১৭ জনকে একসাথে গুলি করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি সেনারা। নিহতেরা সবাই দিনাজপুর শহরের বাসিন্দা ছিলেন। তারা দিনাজপুর থেকে পালানোর পথে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়েছিলেন।
শহীদ আশরাফ : পাটুয়াপাড়ার মতি বেকারীর চাচাত ভাই নুরুল ইসলামের পুত্র আশরাফুল আলম শহীদ হয়েছিলেন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইন্ডিয়া হতে দেশে ফেরার সময়। বর্তমান মুদিপাড়া নিবাসী সাবুল জানান, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দু-তিন দিন পর তিনি নিজে, আশরাফুল ও আরো দুই-তিনজন একসাথে বিরলের মাধববাটি হয়ে দিনাজপুর শহরের দিকে আসছিলেন। কিন্তু আশরাফুল ইসলাম হঠাৎ করে তাদের দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রেল লাইনের দিকে হাটতে থাকে। আমরা একদিকে, সে আরেক দিকে। সে যখন বুনিয়াদপুর মাদ্রাসার কাছে তুলাই নদীর ব্রিজের কাছে যায় তখুনি মাইন বিস্ফোরিত হয়ে পুরো শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে মারা যায়। মাইন বিস্ফেরণে তার পুরো শরীর উড়ে গিয়েছিল।

উল্লিখিত ব্যক্তিগণ ছাড়াও পাটুয়াপাড়ার আরো দু’জন শহীদ হলেন দুই সহদোর আসাদুর রহমান ও মিজানুর রহমান। তাঁকে নিয়ে আলাদাভাবে লেখা দেয়া হবে। এছাড়া পাটুয়াপাড়ার আরেকজন শহীদ হলেন মাহিজান বেওয়া। তাঁর সম্পর্কে আলাদাভাবে লেখা হয়েছিল, যা ইতোপূর্বে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল বিধায় এখানে তাঁর সম্পর্কে কিছু লেখা হলো না।

আজহারুল আজাদ জুয়েল, সাংবাদিক, কলামিষ্ট, মক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।
ই-মেইল- a.azadjewel@gmail.com

Facebook Comments