মুক্তিযুদ্ধকালীন দিনাজপুরের হরিজন জনগোষ্ঠীর ভীতিকর জীবন

 Posted on

মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে মিছিলে অংশ নেয়া হরিজন জনগোষ্ঠীর কয়েকজন
মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে মিছিলে অংশ নেয়া হরিজন জনগোষ্ঠীর কয়েকজন

আজহারুল আজাদ জুয়েল, দিনাজপুর :
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। পাকিস্তানি সেনারা কার্ফু জারি করেছে। সেই কার্ফু উপেক্ষা করছে বাঙালিরা। কার্ফু উপেক্ষা করে প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে পুরো দিনাজপুর শহর। চারদিকে জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে বাঙালিরা হানাদার মোকাবেলায় ব্যস্ত। বাঙালি-বিহারি মার-মার, কাট-কাট অবস্থা। এমনি এক চরম উত্তেজনার মধ্যে বালুবাড়ি হরিজন কলোনীর বাসিন্দা এবং দিনাজপুর পৌরসভার সুপারভাইজার শিব প্রসাদ কর পৌর কার্যালয় থেকে ফিরে এসে বললেন, “আমাদেরকে জয় বাংলা মিছিলে বের হতে হবে। তা না হলে বিহারি ভেবে বাঙালিরা আমাদের উপরে হামলা চালাতে পারে।”

শিব প্রসাদের এই আশঙ্কার যৌক্তিক কারণ ছিল। কারণ, দিনাজপুরের সুইপার কলোনীর বাসিন্দাদের মাতৃভাষা হচ্ছে উত্তর প্রদেশীয় হিন্দি। তাদেরকে দিনাজপুরের মহারাজা পরিচ্ছন্নতা কাজের জন্য উত্তর প্রদেশ হতে নিয়ে এসেছিলেন দেড়শত বছরেরও বেশি সময় আগে। তাদের হিন্দি ভাষা শুনতে অনেকটাই উর্দু বলে মনে হতো। সে কারণেই হয়তো ঐ রকম আশঙ্কা করেছিলেন হরিজন শিব প্রসাদ। তবে তাদের সম্প্রদায়ের লোকজন তখন স্বাধীনতার পক্ষেই ছিলেন।

“আমরা তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলাম। আমাদের সবাই চাইছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হোক।” জানালেন ৮১ বছরের আশরাফি হেলা।

 

আশরাফি হেলা
আশরাফি হেলা

আশরাফির মতে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে দিনাজপুরের হরিজন সম্প্রদায়ের লোকেরা নৌকা মার্কাতেই ভোট দিয়েছিল, যদিও মিছিলে-মিটিংয়ে আমরা থাকতাম না।
আশরাফি হেলার বর্তমান বয়স ৮১ বছরের বেশি। তিনি বলেন, “৫০ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধকালে জোয়ান ছিলাম। রক্ত টগবগ করছিল। কিন্তু আমাদের মধ্যে তো কেউ নেতা ছিল না যে, মিছিল করব। যখন শিব প্রসাদ এসে বললেন, মিছিল করতে হবে। তখন আমাদের ২০-২৫ যুবক একত্রিত হয়ে দুপুর আড়াইটার দিকে মিছিল বের করলাম। জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে বাঙালিদের মিছিলের সাথে যুক্ত হয়ে হাসপাতাল মোড়, পৌরসভা, রেল স্টেশনসহ অনেক দূর পর্যন্ত গেলাম। যেদিন কুঠিবাড়ি পাকিস্তানি সেনাদের কাছ থেকে দখল করা হলো (২৮ মার্চ ১৯৭১) সেদিনও মিছিল করতে করতে লাঠিসোটা নিয়ে কুঠিবাড়ি গিয়েছিলাম এবং বাঙালিদের সাথে থেকে কুঠিবাড়ি দখলে সহযোগিতা করেছিলাম।”
শিব প্রসাদের তথ্য অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে যারা মিছিল করেছেন এবং কুঠিবাড়ি দখলে গিয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন;

* মৃত শিব প্রসাদ হেলা (একাত্তরে বয়স ৫৫), পিতা- মিঠাইলাল হেলা, মাতা- আরতি
* মৃত নন্দলাল দাস হেলা (একাত্তরে বয়স ৫৩) পিতা- গোপাল দাস হেলা, মাতা- কামিনী দাস হেলা
* মৃত পুতুল হেলা (একাত্তরে বয়স ৪৫) পিতা- ঝাল্লু হেলা, মাতা- লক্ষ্মীরানী হেলা
* মৃত মোহিত লাল, (একাত্তরে বয়স ৪২) পিতা- মুন্নীলাল
* মৃত নগীন (একাত্তরে বয়স ৩৮)
* মৃত অনন্ত, (একাত্তরে বয়স ৩৫) পিতা-লালচান
* মৃত সীতারাম, (একাত্তরে বয়স ২৮) পিতা- লালচান
* মৃত বাদল, (একাত্তরে বয়স ৩১) পিতা- লালচান
* মৃত হরিচরণ হেলা (একাত্তরে বয়স ৩২), পিতা- খিরু হেলা, মাতা- তুলসী হেলা
* গোপাল দাস হেলা (বর্তমান বয়স ৮৫), পিতা- লালচান হেলা, মাতা- মঙ্গরী হেলা
* রামদীন হেলা (বর্তমান বয়স ৮২), পিতা- সাইকু হেলা,
* ধীরু দাস সরকার হেলা (বর্তমান বয়স ৬৭), পিতা- রামব্রিজ সরকার, মাতা- গুজবাতি সরকার
* আশরাফি হেলা (৮১), পিতা-রাম অবতার, মাতা- আছিয়া
* জীবন হেলা (৬৭), পিতা- বংশীলাল হেলা, মাতা- রেনুবালা

দিনাজপুর শহরে হরিজনদের মূল আবাসস্থল হলো বালুবাড়ি হরিজন পল্লী। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই পল্লীতে ৪০-৫০টি পরিবার বসবাস করত। হরিজন সম্প্রদায়ের প্রবীণ ব্যক্তিদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর অধিকাংশ পরিবার প্রাণ বাঁচানোর জন্য রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জ, বালুরঘাট, গঙ্গারামপুরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। কিছু পরিবার যেমন মুন্নী লাল, লক্ষ্মীরানী, জয়রাজ, সুরেশ, জমাহিরের পরিবারসহ কয়েকটি পরিবার থেকে গিয়েছিল। যারা ছিল, পাকিস্তানি সেনারা বিহারিদের প্ররোচনায় তাদের উপর প্রথম দিকে নির্যাতন চালিয়েছিল। পরে যখন জানতে পারে যে, তারা বাঙালি নয় হরিজন, তখন নির্যাতন বন্ধ করে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, লাশ টানা ও দাফন করাসহ বিভিন্ন কাজে লাগিয়েছিল। ৬৭ বছরের ধীরু দাস হেলা বলেন, পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প ঝাড়– দেয়া, টয়লেট পরিস্কার করা, লাশ টানার কাজে লাগানো হয়েছিল আমাদেরকে।

রেনুবালা হলেন (৬০) হলেন হরিজন পল্লীর একজন সচেতন নারী, যিনি দিনাজপুর সদর হাসপাতালে চাকরি করছেন। তার পিতা- মৃত কনিক লাল হেলা, মাতা- মৃত কৈলাশিয়া হেলা। স্বামীর নাম- মৃত হরিচরণ হেলা। মুক্তিযুদ্ধের সময় ৯-১০ বছর বয়স ছিল রেনুবালার। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “যেদিন পাকিস্তানি সেনারা দিনাজপুর শহর দখল করতে আসছিল সেদিন আমি আমাদের বাড়ির সামনের বটগাছের নীচে খেলছিলাম। হঠাৎ চারদিক থেকে বোমা আর গুলির আওয়াজ আসতে থাকে। তখন আমার মা ডাক দেয়, চলে আয়, চলে আয়, গুলি হচ্ছে চলে আয়। আর আমি দৌঁড় দিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ি। সে কি ভয়। বুক ঢুকপুক করছিল। পরে শুনি গুলি আসছে দশমাইল থেকে। এরপর আমরা সবাই ঘুঘুডাঙ্গা বর্ডার দিয়ে ইন্ডিয়া যাই। আমার বড় বোনের নাম পুতুল। তার পেটে বাচ্চা ছিল। ঐ অবস্থায় তাকে নিয়ে ইন্ডিয়া যাই এবং ইন্ডিয়ার কালদিঘী হাসপাতালে ভর্তি করে দেই। সেখানে তার বাচ্চা হয়। সে আর বাংলাদেশে আসে নাই। আমার বাবা কালদিঘী হাসপাতালে বেশ কিছুদিন চাকরি করেন। পরে যখন জানতে পারি যে, দেশের অবস্থা ভালো হয়েছে তখন বড় বোন বাদে সবাই ফিরে আসি। কিন্তু এখানে এসে শুনি, আমার মামা মুন্নীলাল সাহাকে খান সেনারা রাইফেলের বাট দিয়ে বেদম মেরেছিল। তার মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়েছিল। এরপর থেকে তার কোন সন্ধান আর পাওয়া যায় নাই। মামার মেয়ে এখনো বেঁচে আছেন। কিন্তু মামাকে আমরা পাইনি।”

রেনুবালার কথায় জানা যায় যে, পাকিস্তানি সেনারা মাঝে মাঝেই হরিজন পল্লীতে গাড়ি নিয়ে আসত। টহল দিয়ে চলে যেত। তারা তার বাবা কনিক লালকে মাঝে মাঝে তুলে নিয়ে গিয়ে লাশ টানা, লাশ মাটি চাপা দেয়ার কাজে লাগাত। কিন্তু কোন টাকা-পয়সা দিত না। হুকুম দিয়ে হরিজনদের খাটিয়ে নিত। তবে যারা হাসপাতালে, ডিসি অফিসে, পুলিশ অফিসে চাকরি করত তাদেরকে কিছু অর্থ ও খাদ্য সামগ্রী দেয়া হতো। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধে কষ্টকর ও ভীতিকর জীবন যাপন করতে হয়েছে দিনাজপুরের হরিজন জনগোষ্ঠীকে।

আজহারুল আজাদ জুয়েল

আজহারুল আজাদ জুয়েল, সিনিয়র রিপোর্টার- আজকের দেশবার্তা এবং বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সভাপতি।

Facebook Comments