বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অমর নাম হবিগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস

 Posted on


মঈন উদ্দিন আহমেদ, হবিগঞ্জ : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অমর নাম হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস, বীরবিক্রম। ১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর (চূড়ান্ত বিজয়ের ১ মাস আগে) পাকিস্তানি হায়েনাদের সাথে সম্মুখ সমরে বীরদর্পে যুদ্ধ করে দেশমাতৃকার জন্য শহীদ হন তিনি। মৃত্যুর পর তার মরদেহের উপর পৈশাচিক তান্ডব চালায় নরপশুরা। সেই বেদনাময় ইতিহাস আজ অনেকের কাছেই অজানা।
১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জগৎজ্যোতি দাস শ্যামা। জিতেন্দ্র দাস ও হরিমতী দাসের কনিষ্ঠ পুত্র জগৎজ্যোতি দাস ওরফে শ্যামা। ১৯৬৮ সালে মেট্রিক পাস করার পর ভর্তি হন সুনামগঞ্জ কলেজে এবং ছাত্র ইউনিয়নে যোগদেন। তেজোদীপ্ত, বিপ্লবী এই অসম সাহসী যুবক আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। ১৯৬৯ সালে আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে চলে যান ভারতের গোহাটিতে। সেখানে বিভিন্ন ভাষা, অস্ত্র চালনার কৌশল রপ্ত করে ফিরে আসেন বাংলাদেশে। আসার কিছুুদিন পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ২১ দিনের প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ইকো-১ ট্রেনিং ক্যাম্পে যান। সেখানে অ্যামবুশ থেকে বাঁচার কৌশল, গ্রেনেড থ্রোয়িং, শত্রæর সাথে সম্মুখ যুদ্ধের কলাকৌশল রপ্ত করে বিশেষ দক্ষতা অর্জনের পর যোগ দেন ৫নং সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলীর নেতৃত্বাধীন সুনামগঞ্জ-কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোনা ভাটি অঞ্চলের। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর টেকেরঘাট অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে ফায়ারিং স্কোয়ার্ড দাস পার্টি’র কমান্ডার হিসেবে পদোন্নতি ঘটে। দাস পার্টির অফিসিয়াল দলিল ছিল এবং এটি একটি স্বীকৃত গেরিলা বাহিনী। একের পর এক গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের চৌকস বাহিনী হিসেবে পরিগণিত করে সাড়া ফেলে দেয় সমগ্র ভাটি অঞ্চলে। পাকিস্তানিদের কলজে পানি করে দেওয়া এক আতঙ্কের নাম দুর্ধর্ষ যোদ্ধা জগৎ জ্যোতি দাসের নেতৃত্বাধীন দাস পার্টি। সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক, শাল্লা, দিরাই, তাহিরপুর, আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, জামালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ছিল তাদের অপারেশন এলাকা। মাত্র ৩৬ জন গেরিলা সদস্য নিয়ে দাসপার্টি প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছিল। ভৈরব-সুনামগঞ্জ নৌপথ ছিল পাকিস্তানিদের লজিস্টিকস সাপ্লাই রুট। দাসপার্টির অব্যাহত অভিযানের মুখে পাকিস্তানিরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত নৌ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। জগৎজ্যোতি যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে দিরাই, শাল্লা, রানীগঞ্জ, কাদিরগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে অসংখ্য রাজাকারদের আটক করেন। গেরিলা যুদ্ধবিদ্যায় তিনি পারদর্শী ছিলেন। ১৯৭১ সালে ১৬ অক্টোবর পাকিস্তানিদের বার্জ ধ্বংস করে পানিতে নিমজ্জিত করা, পাহাড়পুর অপারেশন, বানিয়াচংয়ে কার্গো বিধ্বস্ত, বানিয়াচং থানা অপারেশন ইত্যাদি ছিল উল্লেখযোগ্য অপারেশন। জগৎ জ্যোতি দাস একক চেষ্টায় একটিমাত্র হালকা মেশিনগান নিয়ে জামালগঞ্জ থানা দখল করেন। তাছাড়া মাত্র এক সেকশন (১০-১২ জন) যোদ্ধা নিয়ে তিনি শ্রীপুর, খালিয়াজুড়ি শত্রæমুক্ত করেন। ১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর, ন্যাশন্যাল গ্রিডের বিদ্যুত লাইন ধ্বংসের জন্য ৩৬ জনের দল নিয়ে খালিয়াজুড়ি থেকে বাহুবলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। পথিমধ্যে বদলপুর নামক স্থানে জেলেদের কাছ থেকে রাজাকাররা চাঁদা আদায় করার কথা শুনে তাৎক্ষণিক নৌকা থামিয়ে রাজাকারদের উপর হামলে পড়েন। দুই তিন জনকে হত্যা করে বাকিদের ধাওয়া করলে তারা নৌকা নিয়ে জলসুখা গ্রামে পলায়ন করে। নিজের গ্রামে রাজাকারদের ধাওয়া করতে গিয়ে তিনিসহ ১২ জন যোদ্ধা পাকিস্তানিদের পূর্ব পরিকল্পিত ফাঁদে পা দেন। ফলে মূল দলের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে সামান্য রসদ নিয়ে বিশাল বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে অনেক রাজাকার ও পাকিস্তানিকে হত্যা করেন। একটা সময় তার দল ১২ জন থেকে ছোট হয়ে দুইজনে ঠেকে। টিকে রইলেন জগৎ জ্যোতি ও ইলিয়াস। শত্রæর একটি গুলি ইলিয়াসের পেটের পাশ কাটিয়ে চলে যায়। সহযোদ্ধার ক্ষতস্থান গামছা দিয়ে বেঁধে বলে নিরাপদ চলে যেতে। কিন্তু ইলিয়াস পিছপা হননি, আহত অবস্থায়ও যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন। দুজনে অপেক্ষা করছিলেন হয়তো সন্ধ্যা হলে শত্রæর চোখ ফাঁকি দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে যেতে পারবেন। কিন্তু সন্ধ্যার প্রহর পার করার পূর্ব মুহূর্তে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ‘আমি যাইগ্যা’ বলে জ্যোতি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। ইলিয়াস সহযোদ্ধার নিথর দেহ বিলের কাদায় যতটুকু সম্ভব ঢুকিয়ে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে আনেন। পরেরদিন ওই স্থান থেকে মৃত লাশ ভেসে উঠলে স্থানীয় রাজাকাররা আজমিরীগঞ্জ বাজারে নিয়ে পেরেক দিয়ে কাঠের মধ্যে বিদ্ধ করে ঝুলিয়ে রাখে। তার মৃতদেহের উপর থুথু নিক্ষেপ করে এবং প্রচার করে এটি ভারতের দালাল, গাদ্দারের লাশ। ক্ষত-বিক্ষত দেহ সৎকার না করে অবশেষে ভাসিয়ে দেওয়া হয় কুশিয়ারা নদীর জলে। দাস পার্টি ও জগৎ জ্যোতি পাকিস্তানি ও রাজাকারদের কাছে ছিল এক মূর্তিমান আতঙ্ক। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও অল ইন্ডিয়া রেডিওসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম তার বীরত্ব গাথা প্রচার করে সগৌরবে। দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে তাকে বীর বিক্রম উপাধিতে ভূষিত করা হয় (১৯৭৩ সালে গেজেট প্রকাশ)। মুক্তিযুদ্ধে স্বল্প সময়ে যার নেতৃত্বে এতগুলো বীরত্বপূর্র্ণ সফল অভিযান পরিচালিত হয়েছিল সেই জগৎ জ্যোতি দাস মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শত্রæর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছিলেন এবং দেশের তরে ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। দেশ স্বাধীনের ঠিক ১ মাস পূর্বে অস্তমিত হয় সূর্যসন্তান জগৎ জ্যোতি’র জীবন প্রদীপ।

Facebook Comments