প্লাস্টিক পণ্যের প্রভাবে কুটির শিল্প কারিগরদের দুর্দিন

 Posted on


সোহেল রানা, রাজবাড়ী :: রাজবাড়ী জেলার পাংশা পৌর শহরের ৯নং ওয়ার্ডের মৈশালা-মাগুরাডাঙ্গী গ্রামে আদিকাল থেকে গড়ে ওঠে ঋষি পল্লী। এ পল্লীতে ৩৭টি পরিবার বসবাস করে। জনসংখ্যাও কম নয়। ছোট-বড় দিয়ে প্রায় ৪ শতাধিক নারী-পুরুষ রয়েছে। পূর্ব পুরুষের আমল থেকেই তারা এখানে বসবাস করছে। পৌরশহরের মধ্যে বসবাস হলেও এখানে কোন উন্নয়নের ছোয়া লাগেনি। ঋষি পল্লীর মধ্যে কেউ কেউ জমি অন্যত্র বিক্রি করে অনেকে বড় বড় ভবন তুলেছে। ফলে ঋষিদের কুঁড়েঘরগুলো যেন চোখে পড়ার মতো আর নেই। পূর্ব পুরুষেরা আদিকাল থেকেই যে পেশায় সম্পৃক্ত ছিল তারাও সেটা ধরে রেখেছে। তবে দিনবদলের সাথে সাথে তাদের সচেতনতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিটি পরিবারের ছোট ছেলে-মেয়েরা স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করছে। দারিদ্রতার কারণে অনেক ঋষি পরিবারের পূর্ব পুরুষের পেশা ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পের কাজ ধরে রেখেছেন। বর্তমান বাজারে বাঁশ ও বেতের অগ্নিমুল্যের কারণে ও পরিবেশ দূষণীয় প্লাস্টিক পণ্যের বাজারে টিকে থাকাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে।

পাংশা ঋষি পল্লীতে গেলে দেখা যায়, পল্লীর বাসিন্দাদের চলাচলের কোন সড়ক বা সুগমেয় রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হয়নি। ঘনবসতি হওয়ায় ঘরের পাশ ঘেষে যে জায়গা রয়েছে তাই পথ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি পরিবারের সদস্যরা বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরী করছে বাঙ্গালী পরিবারের নিত্য দিনের কাজের জন্য ব্যবহৃত আসবাবপত্র। তাদের তৈরীকৃত আসবাবপত্র গুলোর মধ্যে রয়েছে কুলা, ডালা, চালুন, বেড়ী, খৈ-চালা, ধামা, কাটা, সের, বাঁশের ঝুড়িসহ হরেক রকমের জিনিস। এখন অনেকেই পেশা পরিবর্তন করে কেউ কেউ শহরে তৈরী করেছে সেলুন। আবার যারা বাঁশ ও বেতের তেজসপত্র তৈরী করে তাতে না পোষানোর কারণে কাজের ফাঁকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে বাদ্য যন্ত্র বাজিয়ে থাকে। বাড়ী-ঘরের ফাঁকে-ফাঁকে রয়েছে ডোবা। সামান্য পানি জমেছে। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার সাথে সাথে সেখানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। পানিতে হয়ে যায় একাকার। বাসিন্দাদের পোহাতে হয় দুর্ভোগ। যেন কারোর দুর্ভোগ লাঘবে কোন পদক্ষেপ নেই।

ঋষি পল্লীর বাসিন্দা রনজিৎ কুমার দাস, পরিমল কুমার দাস, অরুন কুমার দাস, জিতেন কুমার দাস, পরশ কুমার দাস জানান, পূর্ব পুরুষের আমল থেকে তারা এখানে বসবাস করছে। আদি পেশা হিসাবে বাঁশ ও বেতের তৈরি তৈজসপত্র তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। বাঁশ ও বেতের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ও তৈরীর জন্য কাচামাল বাঁশ ও বেত আনতে কালুখালী ও মৌকুড়ি বাজারে যেতে হয়। ক্রয় করে আনতে অনেক খরচ পড়ে যায়। অল্প পুঁজিতে তৈরীকৃত মালামাল বিক্রি করে সংসার চালানো দুস্কর হয়ে পড়েছে। অনেকেই বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ গ্রহণ করে বাড়ীর মহিলাদেরকে দিয়ে এসকল তেজসপত্র তৈরী করে আর নিজেরা কেউ সেলুন, বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কাজ, রিক্সা চালানোসহ বিভিন্ন কাজে ঝুঁকে পড়ছে। যে যে রকম পেশাই করুক না কেন, কোনমতে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। বিদ্যুতের ব্যবস্থা যদিও রয়েছে সুপেয় পানির জন্য কোন ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে যার যার পরিবারের জন্য এনজিও ঋণ অথবা ধার দেনা করে ব্যক্তি উদ্যোগে টিউবওয়েল বসিয়েছে। কিছু কিছু পরিবারকে এনজিও ব্র্যাক থেকে স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানার জন্য স্যানিটেশন ব্যবস্থা করার ফলে অন্যান্য পরিবারের সদস্যরা ব্যাক্তি উদ্দ্যোগে স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করেছে। তাদের কুটির শিল্প সম্প্রসারণে ব্যাংক সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা, সরকারী সহযোগিতা, বিভিন্ন এনজিও থেকে অনুদানের ব্যবস্থা করলে তাদের শিল্প আরও সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।

তারা আরও বলেন, আমরা শ্রম দিয়ে তৈরী করলেও পরিবেশ দূষণকারী বর্তমান প্লাস্টিক পণ্যের প্রভাবের কারণে ও কাচামালের অগ্নিমুল্যের কারণে বাজারে টিকে থাকা দুষ্কর হয়ে পড়ছে।

স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সমন্বিত প্রমিলা মুক্তি প্রচেষ্টার পরিচালক মোঃ মোকাররম হোসেন জানান, ইতিমধ্যেই ঋষিদের সরকারী সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়ে অবগত করানোর লক্ষে সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। তাদের দাবী দাওয়া তুলে ধরতে সমিতির মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ করে গড়ে তোলার কাজ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই রাজবাড়ীর ভিপিকেএ থেকে হস্ত ও কুটির শিল্প সম্প্রসারণে তাদেরকে আর্থিক ভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে। ব্যাংক থেকে যদি এদেরকে সহজ শর্তে ঋনের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে এ শিল্প উন্নতি করা সম্ভব হবে।

সোহেল রানা, দি নিউ নেশন, মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক রাজবাড়ী কন্ঠ ও শারি’র হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের, রাজবাড়ী।

Facebook Comments