তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে

 Posted on


সোহেল রানা, রাজবাড়ী :: গ্রাম্য মেলা, সার্কাস, সাপের খেলা, নাগর দোলা, পুতুল নাচ, পালাগান, লাঠি খেলা, নৌকা বাইচ, পুনাহ, নববর্ষ, হাল-খাতা, মহররম, দূর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা, বিবাহ, খৎনা, খাদ্য আনুষ্ঠানিকতা, ঈদ উৎসব এসব জাঁক-জমকের সাথে রাজবাড়ীতে পালন করা হয়। এর মধ্যে মেলা, পার্বণ, মহররম, ঈদ, বিবাহ, খৎনা প্রধান উৎসব হিসাবে পালন করা হয়। আমাদের মেলাগুলিকে মোটামুটি দুইভাগে ভাগ করা যায়। ধর্মীয় চৈত্র সংক্রান্তি, নববর্ষ, রথ যাত্রা, ঝুলন, গাজন, চড়ক, দোল, নবমী, সপ্তমী, বারুণী, পৌষ পার্বন, বুদ্ধ পূর্ণিমা, মাঘি পূর্ণিমা, শিবরাত্রি, মহররম, শবে-ই-বরাত, ঈদ, ওরশ, দেবতা বা দরবেশের মেলা ইত্যাদি। ধর্ম নিরপেক্ষ রাজবাড়ীতে বিভিন্ন লোকায়ত উৎসব নববর্ষ, কৃষিমেলা, ওরশ মেলা, ঘোড় দৌড়ের মেলা, বৃক্ষমেলা, শিল্প মেলা ইত্যাদি হয়ে থাকে। লক্ষণীকোল বুড়ির মেলা, লক্ষণীকোল রাজা সূর্য কুমারের বাড়ী সংলগ্ন কয়েকশত বৎসরের পুরাতন প্রকান্ড বটগাছের নিচে ১ বৈশাখ থেকে ১ মাস ব্যাপী মেলা বসে। সাধারণ লোকে একে বুড়ির মেলা বলে। মেলাটি রাজা সূর্য কুমারের সময় অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে পালিত হতো। পালাগান, যাত্রা, মেলা ও বিনোদন হয়ে থাকে। প্রতি বছরের ১ লা বৈশাখ রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া বাজার কমিটির আয়োজনে বৈশাখী মেলা বসে। প্রতি বছরের আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে রথযাত্রা উপলক্ষ্যে গোয়ালন্দ বাজার, বালিয়াকান্দি উপজেলার রামদিয়া বাজার, রাজবাড়ী পৌরসভার হরিসভা মন্দির প্রাঙ্গণ। আশ্বিনী সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে মেলা (গাশ্বির মেলা) প্রতি বছরের আশ্বিন মাসের সংক্রান্তির দিন কালীপূজার মেলা হয় বালিয়াকান্দি উপজেলার নলিয়া জামালপুর হরিঠাকুরের অঙ্গণে মেলা বসে প্রতি বছর ফাগুন মাসের কৃষ্ণ চতুর্দশী তিথিতে। রাজবাড়ী সদর উপজেলার মালিডাঙ্গা গ্রামের প্রেমচরণ ফকিরের বাড়ী সংলগ্ন মাঠে প্রতি বছরের চৈত্র সংক্রান্তির দিন চড়কের মেলা বসে। ভাব প্রকাশ, ব্যবহার রীতি, আদান প্রদান এবং ভাষা ব্যবহারেও অঞ্চল ভিত্তিক বিশেষত্ব আছে। মূলত এগুলো তাদের শত শত বৎসরের লোকজ মানুষের সাংস্কৃতিক প্রকাশ। রাজবাড়ী জেলার ভৌগোলিক অবস্থান কুষ্টিয়া, যশোহর, ফরিদপুর, পাবনা ও মানিকগঞ্জ এর প্রভাবে প্রভাবিত। এসব জেলা থেকে কম-বেশী মানুষের রাজবাড়ী জেলায় অভিবাসিত হলেও বেশী পরিমাণ অভিবাসন রয়েছে পাবনা জেলা থেকে। ষাটের দশকে কুমিল্লা, নোয়াখালী থেকেও কিছু পরিমাণ মানুষের অভিবাসন ঘটে রাজবাড়ী জেলায়। রাজবাড়ী ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গের এলাকা। বঙ্গ ছিল ভাটির দেশ। বঙ্গ বলতে সমতটীয় বর্তমান রাজবাড়ী, ফরিদপুর, যশোহরকে বোঝান হয়। বঙ্গের মানুষের সাধারণ জীবনচারিতা এরা সহজ-সরল আড়ম্বরহীন জীবনে অভ্যন্ত। ইষ্টিকুটুম বাড়ীতে এলে সবাই আনন্দিত হয়। চাউলের রুটির সাথে মুরগীর গোস্ত, সে সাথে চিতাই পিঠা, প্রিয়। ধুপিপিঠা, কুশলীপিঠা তৈরী করে। ইলিশ, কৈ, মাগুর, শোল, বোয়াল এসব গ্রামীণ মানুষের প্রিয় খাবার। এককালে এলাকাটি হিন্দু প্রধান এলাকা ছিল। এখনও অনেক হিন্দু বসবাস করে। হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে একে অপরের সাথে ভাব ভালবাসার অভাব নেই। মুসলমানদের বাড়ীর দাওয়াত হিন্দু খায়, হিন্দুর নিমন্ত্রণে মুসলমান তাদের বাড়ীতে যায়। মুসলমান একে অপরকে দেখলে সালাম এবং হিন্দু আদাব করে। তবে সকলেই জীবনাচরণ একসাথে, একমাঠে, একঘাটে। ভাষা ব্যবহারে রাজবাড়ীর মানুষের বিশেষত্ব রয়েছে। এরা ভাইকে বাই, উঠানকে উঠোন, কেমন করে অর্থ্যাৎ ক্যাম্বা, যেমনকে অর্থ্যাৎ য্যাম্বা, খাওয়াকে বলে খাবনে, যাওয়াকে বলে যাবনে, যাওনা কেন বলবে যাসনে কেন, আসিসনে কেন, হওয়াকে বলে হয়া, যাওয়াকে বলে যাওয়া, বেগুনকে বলে বাগুন, লাউকে কদু, কুকুরকে কুত্তো, কুমড়াকে কুমড়ো, তেলেকে তেলো বলে। আবার পাবনার প্রভাবিত অনেকে ‘‘স’’ এর স্থলে ‘‘হ’’ উচ্চারণ করে যেমন সবকে হব, সুঁইকে হুই, সন্ধাকে হন্দে ভাষা ব্যবহার করে।

সোহেল রানা, নিউ নেশন, সম্পাদক, রাজবাড়ী টাইমস , মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক রাজবাড়ী কন্ঠ ও শারি”র হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য, রাজবাড়ী।

Facebook Comments