ঠাই হয়নি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় : একাত্তরের শহীদ ভাগীরথী সাহা বেঁচে আছেন পিরোজপুর শহরের একটি নামফলকের মাঝে

 Posted on

আজও সুবিচার পাননি একাত্তরের শহীদ ভাগীরথী সাহা। ঠিক ৪৯ বছর আগে ১৩ই সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে শহীদ ভাগীরথী’কে পিরোজপুর শহরের রাস্তায় পাকিস্তানী হার্মাদ ও দেশীয় পশু রাজাকার’রা জীপের (মতান্তর মোটর সাইকেল) সাথে বেঁধে টেনে হিঁচড়ে হত্যা করেছিল। পিরোজপুর শহরের ধূলিকণা তথা বাংলাদেশের মাটিতে চিরদিনের জন্য মিশে গিয়েছেন এই বীর নারী।

আমাদের অমার্জনীয় বিস্মৃতির বলি, শহীদ ভাগীরথী নেই কোন আলোচনায়। তিনি নেই শহীদ তালিকায়, তাঁর ঠাই হয়নি মুক্তিযোদ্ধা’র তালিকায়। হায় ভাগীরথী, হায়।
বিশ্বাস করি, বলেশ্বর নদী যদি বলতে পারতো, কাঁদতে পারতো তবে আমরা শুনতে পেতাম স্বাধীনতা অর্জনের পথে প্রান উৎসর্গকারী শহীদ ভাগীরথীর হৃদয়ভাঙা আখ্যান, শুনতে পেতাম অগণিত নিপীড়িত মানুষের শেষ উচ্চারণ।যাঁদের পরম মমতায় আশ্রয় দিয়েছে বলেশ্বর নদী তার বুকে।

বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার দেবীপুর গ্রামে ভাগীরথী সাহা’র জন্ম ১৯৪০ সালে। বাবা মুড়ি বিক্রি করতেন। স্কুলে পড়ার সুযোগ হয়নি ভাগীরথীর। ১৯৫৬ সালে বিয়ে হয়েছিল প্রিয়নাথ সাহার সঙ্গে। ১৯৬৭ সালে দুটি শিশু ছেলে রেখে প্রিয়নাথ মারা যান।

একাত্তরের, মে মাসে স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকি পশুরা শারীরিক নির্যাতন করেছিল এই মহীয়সী বীর মানুষটিকে। একাধিকবার নির্যাতনের শিকার হবার পর, মৃত্যুই একমাত্র পরিত্রাণের উপায় বলে ভাবতে লাগলেন। ভাবতে ভাবতেই এক সময় এলো নতুন চিন্তা, হ্যাঁ মৃত্যুই যদি বরণ করতে হয় ওদেরই বা রেহাই দেব কেন? ভাগীরথী কৌশলের আশ্রয় নিলেন এবার। পাকিস্তানী সেনাদের আস্থা অর্জনে অভিনয় করা শুরু করলেন তিনি। এক পর্যায়ে তাঁকে আটকে না রেখে তাঁর বাড়িতে যাবার সুযোগ করে দেয়া হয়।

ভাগীরথী, এরপর জেনে নিতে শুরু করলেন গোপন তথ্য। নিয়মিত সামরিক ক্যাম্পে গিয়ে আবার ফিরে আসেন নিজ গ্রামে। এভাবে, ভাগীরথী তাঁর মূল লক্ষ্য অর্জনের পথেও এগিয়ে গেলেন অনেকখানি। গোপনেই মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে স্থাপন করলেন যোগাযোগ, জানাতে লাগলেন পাকিস্তানী সেনা ক্যাম্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

পিরোজপুর মহকুমা সদরের বাগমারাসহ আশপাশের গ্রামগুলোয় মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হতে থাকেন। ১৩ আগস্ট সরোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা একপাইজুজখোলা গ্রামে অবস্থান নেন। খবর পেয়ে মতিউর রহমান সরদারের নেতৃত্বাধীন দলটিও এসে যোগ দেন। পাকিস্তানীদের গতিবিধি নজর রাখতে ভাগীরথীকে দায়িত্ব দেন মুক্তিযোদ্ধারা।

শহরে এসে ভাগীরথী পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পের আশপাশে ঘুরতে থাকেন। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সুবেদার সেলিম তাঁকে ক্যাম্পের ভেতরে নিয়ে যায়। বলে, ‘বোলো মুক্তি কাঁহা, বহোত ইনাম মিলবে।’ ভাগীরথী মাঝেমধ্যেই পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে যান আর ভুলভাল তথ্য দিয়ে আসেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রস্তুত রেখে তিনি ২৯ আগস্ট পাকিস্তানি সেনাদের বাগমারায় নিয়ে আসেন। ওই দিন মুক্তিযোদ্ধাদের অতর্কিত আক্রমণে বেশ কিছু সৈন্য মারাত্মকভাবে আহত হয়। শহরে ফিরে যাওয়ার পথে খানাকুনিয়ারীতেও তারা গেরিলা আক্রমণের শিকার হয়। শহীদ ভাগীরথী পাকিস্তানী সেনাদের বিপদে ফেলেছিল সেপ্টেম্বরের ৮ ও ৯ তারিখেও।

ক্যাম্পে ফিরে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ক্যাপ্টেন এজাজ নিশ্চিত হয়, ভাগীরথী মুক্তিযোদ্ধাদের চর। তাঁকে হত্যার নির্দেশ এবং একইসাথে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল জীবিত অথবা মৃত ভাগীরথীকে ধরিয়ে দিতে পারলে, দেয়া হবে নগদ এক হাজার টাকা পুরস্কার।

কিন্তু, শহীদ ভাগীরথী তখনও জানতেন না কি দুঃসহ ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে। ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি পুনর্বার যান শহরে। এদিনই রাজাকারদের হাতে ধরা পরেন। ক্যাম্পে খবর পাঠায় তারা। একাধিক বিবরণ থেকে জানা যায়, দুই পাকিস্তানী সেনা আর ছয় রাজাকার এসে ভাগীরথীকে ধরে নিয়ে ক্যাপ্টেন এজাজের সামনে হাজির করে।

ক্যাপ্টেন এজাজ, সুবেদার সেলিমকে নির্দেশ দেয় তাঁকে হত্যা করার। এরপর দুজন সিপাহি রশি দিয়ে ভাগীরথীর দুই হাত বেঁধে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দেয়। পশুরা ভাগীরথীর ওপর অবিশ্বাস্য হিংস্রতা প্রদর্শন করেছিল। সেদিন হাটবারে তাঁকে শহরের রাস্তায় এনে দাঁড় করানো হয়েছিল জনবহুল চৌমাথায়।

সেখানে প্রকাশ্যে তাঁর পোশাক খুলে ফেলা হয়। তারপর দু’গাছি দড়ি দুপায়ে বেঁধে একটি জীপে (মতান্তরে মোটর সাইকেল) বেঁধে রক্তমাংসের জীবিত ভাগীরথী’কে পিরোজপুর শহরের রাস্তায় টেনে বেড়ায় পাকিস্তানী জানোয়ারের দল। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে সুবেদার সেলিম আবার যখন ফিরে এলো সেই চৌমাথায়, তখনও শহীদ ভাগীরথীর দেহে প্রাণের স্পন্দন ছিল। এরপর গুলি করে হত্যার পর ভাগীরথীর নিথর দেহ বলেশ্বর নদে নিক্ষেপ করে।

আমাদের জানা নেই, বীভৎসতা আর কতোটা নির্মম হতে পারে। আমাদের জানা নেই, ইতিহাসের নৃশংস ও বর্বরতম গণহত্যার জন্য দায়ী পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা, সেনা সদস্য এবং ঘাতক রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের বিচার কখনো হবে কিনা। শহীদ ভাগীরথী হত্যার সাথে সাইদী’র নাম এসেছে, সাইদী’র বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সমূহের মাঝে ১৮ নম্বর অভিযোগটি ছিল তাঁকে পাকিস্তানী সেনাদের হাতে তুলে দেওয়া।

শহীদ ভাগীরথীর দুই সন্তানের মাঝে, কার্তিক যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। অপর ছেলে গণেশ দিনমজুরের কাজ করেন।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পিরোজপুর শহরের একটি নামফলকের মাঝে বেঁচে আছেন শহীদ ভাগীরথী। শহীদ ভাগীরথী বাংলার আর কোথাও নেই। শুধু বেঁচে আছেন, দিনমজুর ছেলে গণেশের স্মৃতিতে, গণেশ যখন হেঁটে যান সেই রাস্তা দিয়ে যে রাস্তায় তাঁর শহীদ জননীর রক্ত-মাংস মিশে গেছে।

আজ ১৩ই সেপ্টেম্বর, শহীদ ভাগীরথী সাহার ৪৯ তম মৃত্যুবার্ষিকী। আমাদের সম্মিলিত নির্লজ্জ বিস্মৃতির বলি ‘ভাগীরথী’কে স্মরণ করি আর্দ্র হৃদয়ে, সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে।
যদি, সাধ্য থাকতো তবে পিরোজপুর শহরের এই রাস্তা আমরা গোলাপের পাপড়িতে ছেয়ে দিতাম।

পরম করুণাময় আপনাকে চিরশান্তির স্থানে আসীন করুন। – গেরিলা ১৯৭১

Facebook Comments