জীবন সংগ্রামের নানা জটিলতায় হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালী উৎসব

 Posted on

মশিউর রহমান টিপু, পটুয়াখালী :: এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি না থাকলেও উৎসব আনন্দের কমতি ছিল না। এক সময় পটুয়াখালীর ঘরে ঘরে নবান্ন হতো। মুখে ভাত, হাতে খড়ি, পূর্জা-পার্বন, পুতুল খেলা, যাত্রা, জারী, গান, কবিগান ছিল বাঙালী উৎসবের বড় অংশ। নীলপূজা, দোল পূর্ণিমা, কাকনের মেলা, বিয়ে-শাদীর ক্ষেত্রে নানা লোকাচার উৎসব ছিল যা হারিয়ে গেছে। এখানে আগে পহেলা বৈশাখ মেলা হতো । এখন বৈশাখী মেলা নামে হচ্ছে। এ অঞ্চলে চড়ক পূজার সময় চৈত্র মাসে একটা মেলা হতো। এ মেলায় ধনী-গরিবসহ নির্বিশেষে সবাই অংশগ্রহণ করতো। পটুয়াখালীর কালীশুরী, কালাইয়া, মদনপুরা, কুয়াকাটা, দশমিনা, তাতেরকাঠী, গলাচিপায় বড় মেলা বসতো। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষে গিয়ে এসব মেলায় অংশ নিতো। সময়ের বিবর্তনে এগুলো এখন হারিয়ে গেছে।
এ বিষয়ে পটুয়াখালীর প্রবীন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নির্মল কুমার দাশগুপ্ত বলেন, আমাদের জীবনে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক সংকটের কারনে অনেক উৎসব, পার্বন একেবারেই পালন না করলেই নয়, সেগুলোই পালন করছি। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই একই অবস্থায় রয়েছি। একটা সময়ে এখানে জমিদারী প্রথা ছিল। তারা বাঙালী অনেক উৎসবের পৃষ্ঠপোষকতা করতো। এখন এসব উৎসবের পৃষ্ঠপোষকতা নেই। সামাজিক বাস্তবতায় মানুষ কিভাবে তার সংসার চালাবে, জীবনধারন করবে সেসব নিয়েই ভাবতে হচ্ছে। আগে মানুষের জীবনে এতটা ব্যস্ততা ছিল না। তারা ঘরের ভাত খেয়েই সব করতো। বর্তমানে সেই বাস্তবতা নেই। ঢাকার রমনায় বটমূলে ছায়ানটের বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা হামলাসহ বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে কিছু লোক মারা যায়। এসব ঘটনার ফলে মানুষ অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের গুঠিয়ে নিয়েছে। এরপর থেকে উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকার বিভিন্ন বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। এসব কারনেও বাঙালী উৎসবের বিকাশ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া বাঙালী উৎসব পূনরুদ্ধার বা ফিরিয়ে আনা খুবই কঠিন ব্যাপার। এ ব্যাপারে রাষ্ট্র ও সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনকেও এগিয়ে আসতে হবে। এ বিষয়ে পটুয়াখালী উদীচীর সহ-সভাপতি অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান মিলন বলেন- সভ্যতা বিকাশের জায়গা থেকে যেগুলো মানুষের মুক্তির ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা রাখতে পারে না সেগুলো এমনিতেই হারিয়ে যায়। আর সেই উৎসব সংস্কৃতিই অগ্রসর হয় যা মানুষের বিকাশের ক্ষেত্রে সহায়ক। সেই উৎসব সংস্কৃতিই টিকে থাকে। বাঙালীর উৎসব সংস্কৃতির যে বিষয়গুলো আছে তা বেশীর ভাগই গ্রামীণ নির্ভর। নগর সভ্যতা আমাদের দেশে খুব বেশী দিনের নয়। আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান, স্বাভাবিক কারনেই কৃষিনির্ভরতা গ্রামীণ জায়গা থেকেই হয়। সেই গ্রামীণ সংস্কৃতিতে যে পরিবর্তন আসছে তাতে আমাদের আদি সংস্কৃতির প্রভাব হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন- সাম্প্রতিক সময়ে পহেলা বৈশাখ রাষ্টীয়ভাবে পালনের একটা উদ্যোগ সরকারের রয়েছে। যদিও মৌলবাদীরা বৈশাখের আয়োজনকে তাদের আক্রমনের লক্ষ বস্তুতে পরিণত করেছে। আমরা যদি মৌলবাদীদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেই তা হলে বাঙালী উৎসব ও সংস্কৃতি সবই বাধার সম্মুখিন হবে। বিষয়টি নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে। তা না হলে বাঙালী জাতির বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যাবে। কৃষ্টি বা কালচার কৃষির সাথেই যুক্ত। কৃষিতে যন্ত্রায়নের ফলে কৃষিকাজের মাঝে মানুষ যে সময়টা আনন্দ-ফুর্তি করতে পেত তখন আর তা পায় না। সে সময়টা সে দিতে পারে না। গ্রামীণ নারীরাও বেঁচে থাকার তাগিদে নানাকাজে জড়িয়ে পড়েছে। আত্মিক সামাজিকতা যান্ত্রিক সভ্যতার কারনে কমে গেছে। যান্ত্রিক সভ্যতা আত্মীক সভ্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে। আমরা এ বিষয়টি যদি গুরুত্ব সহকারে বিচার না করি এবং এর ভেতর সমন্বয় করতে না পারি তাহলে মানবিক বিকাশের জায়গা রুদ্ধ হয়ে যাবে। আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারময় হয়ে যাবে। এ বিষয়ে সবার নজর দেয়া দরকার। অঞ্চলভিত্তিক, এলাকাভিত্তিক যে উৎসবগুলো ছিল তা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে রাষ্টীয়ভাবে মূখ্য ভূমিকা নিতে হবে।

মশিউর রহমান টিপু, দৈনিক খোলাকাগজ, পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি এবং শারি’র মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য

Facebook Comments