গণহত্যায় বেঁচে যাওয়া সুন্দরী খুঁজে ফেরেন তাঁর পিতামাতার পরিচয়

 Posted on

রঞ্জন বকসী নুপু : একজন রাজকুমারী সরকার। ডাক নাম সুন্দরী। সকলে সুন্দরী নামেই চিনে। বয়স বাংলাদেশের বয়সের চেয়ে ছয় মাস বেশি। ১৯৭১ সাল। দেশে যুদ্ধ চলছে। মে মাসের শেষের দিকে। সুন্দরীর পিতা-মাতা সহ সুন্দরীও পালিয়ে ভারতে যেতে লাগলো। বিপত্তি পথিমধ্যে। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরের কাছে যাওয়ার পরেই পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাদেরকে ধরে ফেলে। রেহাই নেই। ধরেই পাশ্র্ববর্তী নদীর তীরে দিয়ে দাঁড় করিয়ে গুলি করে ওদের সকলকে। সাথে আরও লোক ছিল। তাদেরই একজন এলাকার এরশাদ মোড়লের পিতা। পাক বাহিনী চলে যাবার পরে এরশাদ মোড়ল তার পিতাকে ওই বধ্যভূমিতে খুঁজতে আসলে শিশুর কান্না শুনতে পায়। দেখে একটি শিশু তার মায়ের বুকের ওপর দুধ পানরত অবস্থায়। মা মরে পড়ে আছে। এরশাদ মোড়ল তাকে নিয়ে আসেন এবং পাশ্র্ববর্তী মান্দার মোড়লের কাছে শিমুটি লালন পালন করার জন্য দেন। সেখানেই সুন্দরী পালিত।
অতি সম্প্রতি ডুমুরিয়া উপজেলা শিল্পকলা একাডেমীতে বসে কথা হয় সুন্দরীর সাথে। জানালেন উপরোক্ত কথাগুলো। আরও অনেক কিছু। মান্দার দাস তার নামকরন করেন রাজকুমারী। আর সকলে তাকে ডাকে সুন্দরী বলে। আস্তে আস্তে মান্দার লালের সংসারে বড় হয় সুন্দরী। তাকে বিয়ে দেয়া হয় চুকনগরের এক ধর্মান্তরিত বাটুল দাসের সাথে। এই বাটুল দাস ছিল হিন্দু। অভাবের তাড়নায় খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষিত। তিনি পেশায় ছিলেন বাজনদার। বিবাহের পরে পর দুটি সন্তান জন্ম দিয়ে বাটুল দাস মারা যান। এর পরে শুরু হয় সুন্দরীর জীবনে বেঁচে থাকা এবং সন্তান লালন করার যুদ্ধ। স্বাধীনতা যুদ্ধে বেঁচে গেলেও এই যুদ্ধে বেঁচে থাকা তার জন্য দুস্কর ছিল বলে তিনি জানান। তার পরেও চেয়ে চিন্তে পরের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে ছেলে দুটোকে বড় করেন। অভাবের তাড়নায় পড়াশুনা আর হয়নি। অভাব এদেরকেও নতুন করে আবার ধর্মান্তরিত করতে বাধ্য করে। ওরা দুভাই সুমন সরকার আর ডেভিড সরকার খৃষ্টান ধর্মে দিক্ষীত হয়ে খৃষ্টান দু মেয়েকে বিয়ে করে এলাকার খৃষ্টান পাড়ায় বসবাস করে। মাকে আর তারা দেখে না। ফলে অগত্যা সুন্দরী আলাদাভাবে বাসা ভাড়া করে একাকী জীবন যাপন শুরু করে। জঠর জ্বালা যখন আর সহ্য করার মত নয়, তখন নাট্যকর্মী লিয়াকত আলী লাকির সুপারিশে এবং খুলনার নাট্যকর্মী শরিফুল ইসলাম সেলিমসহ অন্যান্যদের সহযোগিতায় সুন্দরীকে ডুমুরিয়া উপজেলা শিল্পকলা একাডেমীতে আয়ার চাকুরী দেয়া হয়। যা সামান্য বেতন পান তা দিয়ে নিজের একার সংসার চালানোর পরে আবার ছেলেদেরকেও কিছু টাকা দেন প্রতি মাসে।
ডুমুরিয়ার নিতীশদা জানালেন সুন্দরীর জীবিকার সংস্থানের জন্য ডুমুরিয়ার ছেলেদের অবদান অনেক।
অশ্রুসজল চোখে সুন্দরী জানালেন, অনেক চেষ্টা করা হয়েছে, তাকেও খৃষ্টান হওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি ধর্মান্তরিত হন নি। এখনও নিজ ধর্ম হিন্দুত্বে বিশ্বাসী। তিনি জানালেন, তার বাড়ি কোথায়, তা আজ পর্যন্ত জানতে পারেন নি। বাবা-মা কারা ছিলেন সে সম্পর্কে আজও জানতে পারেন নি। শুধু এইটুকুই জানেন স্বাধীন দেশ তার বাবা মাকে নিয়ে গেছে। এতকিছুর পরেও সুন্দরী কোন সরকারী সাহায্য সহযোগিতা পান নি। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে, স্বাধীন দেশে স্বাধীনতার স্বাদ অনেকেই ভোগ করছেন। কিন্তু সুন্দরীরা এর ব্যতিক্রম। জীবন সায়াহ্নে এসে সুন্দরীর একটাই চাহিদা তার বাবা-মার পরিচয় জানা।
Facebook Comments