কাউখালীর দলিতদের নিজস্ব মাতৃভাষা ছিল বলে জানে না নতুন প্রজন্ম, বাংলাই তাদের মাতৃভাষা

 Posted on

রবিউল হাসান মনির, পিরোজপুর ঃ জন্ম ও পেশাগত কারণে বৈষম্য এবং বঞ্চনার শিকার মানুষরাই সমাজে দলিত নামে পরিচিতি পায়। বৃটিশ শাসনামলের মাঝামাঝি সময়ের ভারতের বিভিন্ন এলকা থেকে হিন্দি, তেলেগু ভাষাভাষির মানুষেরা তখন এ দেশে আসে। অভাবী এই অধিবাসীরা দেশের সর্বত্র পরিচ্ছন্নতা ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্মী হিসেবে কাজ করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে। বাংলাদেশের দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে হরিজন, ঋষি, ডোম, বাঁশফোড় অন্যতম। এসকল জনগোষ্ঠী তখনকার দিনে হিন্দি ভাষায় কেউবা তেলেগু ভাষায় কথা বলতো। তারা একসময় অবাঙালি দলিত শ্রেণি বলে পরিচিত ছিল। এখন আর এই দলিত জনগোষ্ঠী জনসমক্ষে হিন্দি কিংবা তেলেগু ভাষায় কথা বলে না। অন্যদিকে পিরোজপুরের কাউখালীর দলিত জনগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষা ছিল বলে জানে না তাদের নতুন প্রজন্ম, বাংলায়ই এখন তাদের মাতৃভাষা।

কাউখালী উপজেলার আমরাজুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ইউপি সদস্য বাবু চিত্তরঞ্জন পাল বলেন, আমি ছোট সময়ে কাউখালী উত্তর বাজারে কয়েকটি হরিজন, ঋষি সম্প্রদায়কে বসবাস করতে দেখেছি। তারা মূলত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, পয়ঃনিষ্কাশন, জুতা সেলাই ও চামড়ার কাজ করতো। তখন তাদেরকে হিন্দি ভাষায় কথা বলতে শুনেছি। মূলত হিন্দিই ছিল তাদের মাতৃভাষা। এক সময় এসব সম্প্রদায়ের মানুষজন আমাদের সাথে ওঠাবসা করতে গিয়ে তারাও আমাদের বাংলা ভাষা শিখতে থাকে। কালের বিবর্তনে এই সব সম্প্রদায়ের বর্তমান প্রজন্ম এখন আর হিন্দি ভাষা জানেনই না। বাংলা এখন তাদের মনে প্রাণের ভাষায় পরিণত হয়েছে। বাংলাই তাদের একমাত্র মাতৃভাষা হিসেবে তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে জেনে আসছে। দলিত সম্প্রদায়ের পূর্ব পূরুষদের মাতৃভাষা হিন্দি ছিল তা তাদের মনে নেই। তিনি বলেন, আমাদের দলিত সম্প্রদায়ের অনেকেই ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবেও অংশগ্রহণ করলেও তারা পাননি কোন স্বীকৃতি।

বাংলাদেশ দলিত পরিষদ কাউখালী উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক গোপাল রবিদাস বলেন, আমি আমার বাবা-মায়ের কাছে শুনেছি আমাদের পূর্ব পূরুষরা হিন্দি ভাষায় কথা বলতো। হিন্দি ভাষাই ছিল নাকি তাদের মাতৃভাষা কিন্তু আমার বাবা-মাকে কখনো হিন্দি ভাষায় কথা বলতে শুনি নি। তারা সব সময়ে বাংলা ভাষাতেই কথা বলতেন। বাংলাই আমাদের একমাত্র মাতৃভাষা বলে জানি ও মনে প্রাণে বাংলা ভাষাকে ভালোবাসি। বিশ্বের একমাত্র আমরাই আমাদের ভাষার জন্য অন্দোলনের মাধ্যমে শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই ভাষাকে আমরা পেয়েছি। আজ আমাদের এই ভাষা আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা হিসাবে স্বীকৃতিও পেয়েছে।

শিক্ষার্থী চয়ন পাল বলেন, আমি বাংলা ছাড়া আমাদের অন্য কোন মাতৃভাষা ছিল বলে কোনদিন শুনেনি। আমরা প্রতি বছর ২১ ফেব্রæয়ারি আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষার জন্য যেসব ভাইয়েরা জীবন দিয়ে শহীদ হয়েছেন তাদের স্মরণে সোনাকুর গ্রামে বসবাস করা পাল ও জেলে সম্প্রদায়ের শিশুরা কলাগাছ দিয়ে শহীদ মিনার তৈরি করে সেখানে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জনাই। বাংলাই আমাদের একমাত্র মাতৃভাষা হিসেবই আমরা জানি।

বাংলাদেশে দলিত পরিষদের কাউখালী শাখার সভাপতি বাবুল রবিদাস বলেন, শুনেছি আমাদের পূর্ব পুরুষরা হিন্দি ভাষায় কথা বলতেন, তখন তাদের মাতৃভাষা ছিল নাকি হিন্দি। বিশেষ করে হরিজন, রবিদাস, ঋষি সম্প্রদায়ের মানুষজন হিন্দি ভাষায় কথা বলতো। এখন আর এসব সম্প্রদায়ের শিশু থেকে বৃদ্ধরা কেউই হিন্দি ভাষায় কথা বলা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। এখন সকলেই বাংলাভাষায় কথা বলে থাকে, এটাই তাদের মাতৃভাষা। আমাদের বাবা-মায়েরা চাননি আমরা হিন্দি ভাষায় কথা বলি। দলিত সম্প্রদায়ের কোন অভিভাবকেরা চাননা যে, তাদের সন্তানরা বাংলা ছাড়া অন্য ভাষা চর্চা করুক। দলিতরা মনে করেন, এদেশে আমাদের জন্ম, এখানেই আমরা মানুষ হচ্ছি। এখানের স্কুলে আমাদের সন্তানরা ভর্তি হয়ে বাংলা ভাষায় লেখাপড়া করছে। সরকার আমাদের সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য ফ্রী বই ও উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেছেন। তিনি বলেন আমাদের সন্তানরা এমনকি আমরাও আমাদের পূর্ব পূরুষদের মাতৃভাষা হিন্দিতে কথা বলিনা, এমনকি চর্চাও করি না। বলতে গেলে আমরা এখন হিন্দি ভাষা কেউ বুঝিওনা। দলিত সম্প্রদায়ের অভিভাবকরাও চাননা তাদের সন্তানরা হিন্দি ভাষায় কথা বলুক। বরং আমরা চাই তারা বাংলা ভাষাকে সম্মান করুক ও চর্চা করুক। আমাদের সন্তানরা স্কুলে গিয়ে বাংলা ভাষায় লেখাপড়া করছে তাই বাংলা ভাষাই কথা বলুক। বাংলা ভাষাই আমাদের দলিত সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা।

রবিউল হাসান মনির, পিরোজপুর জেলা প্রতিনিধি, র্পূব পশ্চিম বিডি ডট কম, ডেইলী আওয়ার টাইম, দৈনিক তৃতীয় মাত্রা, বরিশালবানী ডট কম। কাউখালী উপজেলা প্রতিনিধি, দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ, দৈনিক শিক্ষা ডট কম এবং বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরমের সদস্য।

Facebook Comments