আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে দলিত জনগোষ্ঠীর অবদান

 Posted on

মাহমুদুল গনি রিজন, গাইবান্ধা :
মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বোল এক অধ্যায়। সংগ্রাম আর লাখো শহিদের উৎসর্গীত জীবনে অর্জিত আমাদের এই দেশ। কিন্তু এই বিজয়ের নেপথ্যে রয়েছে ত্রিশ লক্ষ শহিদ আর দু’লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ দ্বিজাতি তত্তে¡র উপর ভিত্তি করে পাকিস্তান নামে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু এই ভূখন্ডের মানুষ ছিল বরাবরে অসাম্প্রদায়িক। সকল ধম বর্ণের মানুষ গড়ে তুলেছিল একটি জাতিসত্ত¡া। সেটি ছিল বাঙালি। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মতো সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আবারও একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রাম। দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে পাকিস্তানি শোষণ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামে মধ্য দিয়ে আসে একাত্তর। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃতে সেদিন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জোটসহ সমস্ত শ্রেণি-পেশার সাড়ে কোটি মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে অবতীর্ণ হয় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে। ১৯৭১ সালে নয় মাস পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বিজয়। বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা পায় বাংলাদেশ নামে আরও একটি রাষ্ট্র।

স্বাধীনতা সংগ্রামের এই ধারাবাহিকতায় মহান মুক্তিযুদ্ধে এদেশের সকল ধর্মের বর্ণের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে অংশ নেয়। সেখানে দলিত জনগোষ্ঠীও পিছিয়ে ছিল না। তৎকালীন রংপুর জেলার মহকুমা গাইবান্ধাও অনেকগুলো ছোট বড় যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। সেসব যুদ্ধে এখানকার দলিত জনগোষ্ঠীর মানুষও অংশগ্রহণ করে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থানার বাহাদুর ডোম সেরকমই এক যোদ্ধা ছিলেন। যিনি ভারত থেকে গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ঝাড়–দারের কাজ করে পাকিস্তানি ও তাদের দোসরদের নানা তথ্য সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করতেন। মুক্তিযোদ্ধারা তার তথ্য অনুযায়ী তাদের প্লান করে অপারেশন পরিচালনা করতো। এছাড়াও তিনি ঠাকরগাঁও জেলার বিভিন্ন স্থানেও যুদ্ধে অংশ নেন। জানা গেছে তিনি সেসময় হরিজন সম্প্রদায়ের অনেক যুবককেই গোপনে তার প্রাপ্ত ট্রেনিং করিয়েছিলেন। তিনি একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরবর্তীতে স্বীকৃতি পান। ২০১৩ সালে ২৩ ফেব্রæয়ারি তিনি মারা যান। আরও একজন দলিত হরিজন সম্প্রদায়ের সাদুল্লাপুর থানা সদরের উত্তরপাড়ার শ্রী দুর্গাচরন বাশফোরের ছেলে মেওয়ালাল বাশফোর। তিনি হরিজন সম্প্রদায়ের একজন হয়েও কানুনগো হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ডাক পেয়ে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে (লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-৩১৭০২০০৫৩)।

আবার দলিত জনগোষ্ঠীর রবিদাস সম্প্রদায়ের নারীকেও তার সম্ভ্রম হারাতে হয়েছিল এই পাকিস্তানি হায়েনাদের হাতে। যাকে স্বাধীনতাত্তোর বীরঙ্গনা জননীর মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তিনি হচ্ছেন সাদুল্লাপুর থানার জামালপুর ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের অর্জুন রবিদাসের মেয়ে ও ফসিরাম রবিদাসের স্ত্রী ফুলমতি রবিদাস।

বাংলাদেশ হরিজন যুব ঐক্য পরিষদের আহŸায়ক রাজেশ বাসফোর বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েও দলিত জনগোষ্ঠীর মানুষ আজও দেশের একজন নাগরিক হিসেবে যে মৌলিক অধিকারগুলো পাবার কথা ছিল সেগুলো থেকে তারা বঞ্চিত। যেটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এদশের দলিত ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রয়েছে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নেও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সাংবিধানিকভাবেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

মাহমুদুল গনি রিজন, জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক সংবাদ ও রেডিও টু-ডে এবং সদস্য, বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম।

Facebook Comments