বেদে সম্প্রদায়ের শিশু : যে সময় বই হাতে স্কুলে যাবার কথা ছিল, সেই সময়ে ওদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে সাপের বাক্স

 Posted on

মশিউর রহমান টিপু, পটুয়াখালী প্রতিনিধি ::
বেদে সম্প্রদায় বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ। এ সম্প্রদায়ের মানুষরা যেমন রাষ্ট্রের অবহেলার শিকার। তেমনি অবহেলার শিকার তাদের শিশুরা। সরকার প্রাথমিক শিক্ষ বাধ্যতামূলক করলেও এ জনগোষ্ঠীর শিশুরা শিক্ষার আলো থেক বঞ্চিত। যে বয়সে একটি কোমলমতি শিশু হাতে বই খাতা থাকার কথা- সেই সময়ে বেদে শিশুদের হাতে তুল দেয়া সাপের বাক্স। বেরিয়ে পরতে হয় পরিবারের আহারে খোঁজে। এদের থাকার জন্য নির্দিষ্ট স্থায়ী কোন আবাস নেই। ভাষমান অবস্থায় এরা ঘুরে বেড়ায় দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সরকারী হিসাব মতে দেশে ৭৫ হাজার ৭ শত ২ জন বেদে জনগোষ্ঠী রয়েছে। বেদে সম্প্রদায়ের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষই নিরক্ষর।

এমনি একটি বেদে পল্লি পটুয়াখালী গলাচিপা উপজেলার আমখোলা এলাকায়। অস্থায়ী এ বেদে পল্লীতে রয়েছে ১১টি পরিবার। আমখোলা বাজারের নদীর পাশে জেগে ওঠা চরে আবাস গেড়েছে তারা। পলিথিন, ছেঁড়া ফাটা কাপড় আর কয়েক টুকরা বাঁশ দিয়ে তৈরী হয়েছে তাদের ঘর। এই বেদে পল্লির ১১টি পরিবারে বিদ্যালয়ে যাবার উপযোগী সংখ্যা ১০জন। কিন্তু এরা সবাই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। এই বেদে পল্লির শিশু মিরাজ। বয়স ৮ বছর। মিরাজ জানায়, সকাল হবার পরই তার মা তাকে রেখে গ্রামে চলে গেছে। মা গ্রামে গ্রামে ঘুরে সাপের খেলা দেখায়। তাবিজ-কবজ বিক্রি করে। বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করে। কেউ টাকা দেয়, কেউ দেয় চাল। এভাবে সারাদিন গ্রামে ঘুরে বিকেলে বেদে ফিরে আসে বেদে পল্লিতে। সারাদিন যে টাকা পয়শা পান তা দিয়ে বাজার করেন। তারপর রান্না শুরু হয়, রান্না করতে করতে রাত হয়ে যায়। রাতে ভাত খেয়ে খুমিয়ে পড়ে। সকাল এবং দুপুরে রাতের সেই রান্না করা বাসী খাবার খেয়েই তাদের সারাদিন কাটাতে হয়। মা-বাবা সহ পরিবারের বড়রা সবাই কাজে চলে যায়। বেদে শিশুদের সারাদিন কাটে খেলাধুলো আর ঘোরাঘুরি করে। তাই এলাকায় কিছুদিন থেকে বেদে দলে চলে যায় অন্য এলাকায়। সেখানে আবার শুরু হয় নুতন জীবন। এভাবেই সারা বছর ধরে চলে বেদেদের জীবন চক্র। একেক সময় একেক স্থানে অবস্থানের কারনে স্কুলে যাবার, লেখাপড়া করার আর সুযোগ ঘটে না। ফলে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকছে, বেদে সম্প্রদায়ের শত শত শিশুরা।

বেদে পল্লিতে কথা হয় জাফর (৪৫) এর সাথে তার ২ ছেলে ১ মেয়ে। এর মধ্যে ১ ছেলে ও ১ মেয়ে স্কুলে যাবার বয়সি হলেও কেউই স্কুলে যায়না। জাফর জানান- তার আদি নিবাস মুন্সিগঞ্জ জেলায়। তাদের ঘড়-বাড়ি, জায়গা-জমি সবই ছিল। কিন্তু নদী ভাঙ্গনে তারা নিঃস্ব হয়ে যায়। তাই বাধ্য হয়ে তার মা-বাবার সাথে কিশোর বয়স থেকে শুরু হয় এ যাযাবর জীবন। এ পেশা থেকে ফিরতে চাইলেও আর ফেরা সম্ভব হয়নি। মা-বাবার মৃত্যুর পরে এখন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এভাবেই ঘুরে বেড়ান। শুকনো মৌসুমে খেয়ে পরে যেটুকু সঞ্চয় থাকে তা দিয়ে চলতে হয় বর্ষা মৌসুমে। কারণ বর্ষা মৌসুমে আয় বাণিজ্য তেমন থাকেনা। তার সন্তানদের লেখাপড়া করাতে চান কিনা জানতে চাইলে বলেন- ইচ্ছা থাকলেও আমারাতো স্কুলের কথা চিন্তাও করতে পারিনা। সারা বছর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়াই। কোথাও স্থায়ী ভাবে বসবাস করতে পারিনা। তাই স্কুলে ভর্তি করিয়ে কি লাভ। শীতের মৌসুমের কয়েক মাস এ অঞ্চলে থাকবো। আবার বর্ষা মৌসুম শুরু হলে যেতে হবে উত্তরাঞ্চলে। আমরা কেউই চাইনা আমাদের সন্তানেরা অশিক্ষিত থাকুক। কিন্তু সরকার থেকে যদি আমাদের স্থায়ী আবাসের ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে তাহলে আমরা এ পেশা পরিবর্তন করতে পারি। তা না হলে আমরা খাবো কি ভাবে। আমরা অন্য কোন কাজ তো জানিনা।

এ বিষয়ে পটুয়াখালী সমাজসেবা অধিদপ্তর জানায়- তাদের হিসাব মতে দেশে ৭৫ হাজার ৭ শত ২ জন বেদে জনগোষ্ঠী রয়েছে। এছারা অনগ্রসর জনগোষ্ঠী রয়েছে প্রায় ১০ লাখ ২৯ হাজার ১০৫ জন। জেলে, সন্নাসী, ঋষি, যেয়ারা, নাপিত, ধোপা, নিকারী, পাটনী, পাটিকর, ডোম, এদের অর্ন্তভুক্ত। এর মধ্যে বেদে জনগোষ্ঠীর শতকরা ৯০ ভাগই নিরক্ষর। ৮ টি জনগোষ্ঠীতে বিভক্ত বেদে জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে সাপুড়িয়া, বাজিকর, টোলা, মালবেদে, মির শিকারী, বরিয়ান, সন্দা ও গাইন বেদে।

২০১২-২০১৩ অর্থবছরে বেদে সহ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নে কার্যক্রম শুরু হয়। পাইল কার্যক্রম ভুক্ত ৭ টি জেলা ছিল- পটুয়াখালী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, নওগাঁ, যশোর, বগুরা, জেলা। সে বছর তাদের জন্য বরাদ্দ হয় ৬৬ লাখ টাকা। বর্তমানে ৬৪ জেলাই এ কার্যক্রম চলছে। এ অর্থ বছরে তাদের জন্য ৫৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

এর লক্ষ্য হচ্ছে স্কুলগামী বেদে ও অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করার লক্ষে প্রাথমিক পর্যায়ের প্রত্যেক শিশুকে ৭০০ টাকা, মাধ্যমিক পর্যায়ে ৮০০ টাকা, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ১ হাজার টাকা এবং উচ্চতর শিক্ষার্থীদের ১২০০ টাকা হারে উপবৃত্তি প্রদান করা। এছাড়া বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে তাদের সমাজর মূল ধারায় নিয়ে আসা হবে। বৃত্তি মূলক প্রশিক্ষন প্রাপ্তদের পূর্নবাসনের সহায়তার জন্য দশ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হবে। এসব কর্মসূচীর মাধ্যমে বেদে সহ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল ¯্রােত ধারায় নিয়ে আসার চেস্টা করা হচ্ছে।

মশিউর রহমান টিপু, দৈনিক খোলাকাগজ, পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments