করোনাকালে দিনাজপুরে কাজ ও আয় কমেছে দলিত জনগোষ্ঠীর

 Posted on


আজহারুল আজাদ জুয়েল, দিনাজপুর ::
প্রতিদিন সকাল ৯টায় দিনাজপুর শহরের চারুবাবুর মোড়ে এসে বসেন মন্তোষ রবিদাস। কালি, ব্রাশসহ বিভিন্ন উপকরণে দোকান খুলে বসেন। তার দোকানটি অস্থায়ী। বর্ষা ও তীব্র গরমে মাথার উপরে ছাতা রাখেন। শীতের সময় ছাতা ব্যবহার করেন না।

এই মোড়ে বসার যে মজা কিছুদিন আগে ছিল এখন সেই মজা পাচ্ছেন না মন্তোষ। বললেন, ‘গ্রাহক আসছে না। করোনা ভাইরাসের আগে কত গ্রাহক। প্রতিদিন ৪শ-৫শ টাকা আয়। কোন কোন দিন আয় ৮শ’, হাজার টাকাও আয় ছাড়িয়েছে। এখন টেনেটুনে ২শ’ টাকাই হয় না। কোন কোন দিন ১শ’ টাকার নীচে হয়।’ আয় কমে যাওয়ায় দূর্ভাবনার শেষ থাকে না মন্তোষের।

আগের মত জুতা, স্যান্ডেল মেরামত কিংবা রং করছে না লোকে। ফলে প্রয়োজনীয় আয় হচ্ছে না মন্তোষের। যে আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালাতে পারছেন না তিনি। তার বয়স প্রায় ৩৫। বিয়ে করেছেন বছর তিনেক আগে। চারুবাবুর মোড়ে বসছেন সেই কিশোর বয়স থেকে। জুতা, স্যান্ডেল সেলাই, মেরামত ও রং করে চলছেন প্রায় ২১ বছর ধরে। কিন্তু তার মতে, এমন কষ্টের মধ্যে আগে কখনো পড়েন নাই।

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর সরকার ঘোষিত লকডাউনের সময় দোকান করতে পারেন নাই মন্তোষ। তখন কিছু ত্রাণ পেয়েছিলেন। তিনি যেখানে বসেন তার পাশেই দিনাজপুর প্রেসক্লাবের অবস্থান। তাকে প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম নবী দুলাল দুই দফা ডেকে নিয়ে ত্রাণ দিয়েছে বলে জানালেন তিনি। এ ছাড়া জেলা প্রশাসন থেকেও এক দফা ত্রাণ পেয়েছেন। ‘সেইসব ত্রাণ সামগ্রীর সুবাদে তখন ডাল-ভাত হলেও খেয়েছি। কিন্তু এখনতো আর ত্রাণ পাচ্ছি না। আয়-ইনকামও না হওয়ার মত। কোনদিন দুশ’ তো কোনদিন ৫০। এভাবে দিন পার হচ্ছে না।’ বেশ কষ্টের সাথে বললেন মন্তোষ।

দিনাজপুর জেলা শহরের ভিতরে রবিদাস সম্প্রদায়ের প্রায় অর্ধ সহস্র ব্যক্তি বিভিন্ন স্থানে মন্তোষের মতো করে দোকান দিয়ে থাকেন। জুতা, স্যান্ডেল মেরামত ও রংয়ের কাজ করেন। মন্তোষের মতে তাদের সকলের অবস্থা একই রকম। আয়-রোজগার কমে দিয়ে সবারই দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তার কথার সত্যতা পাওয়া যায় কালিতলার লিখন রবিদাস, বাসুনিয়াপট্টির বাবুলাল রবিদাসের সাথে কথা বলে। লিখনের বয়স প্রায় ২৮ এর মত। মুচির কাজ করছেন প্রায় ১৩ বছরের বেশি সময় ধরে। কয়েকদিন আগে দুপুর ১২টার দিকে তার সাথে আলাপ করাকালে জানালেন যে, সকাল থেকে বসে থেকে এখন পর্যন্ত বহনী করতে পারেন নাই।

অবশ্য বাবুলাল রবিদাসের ভাগ্য লিখনের তুলনায় সেদিন ভাল ছিল। বাসুনিয়া পট্টিতে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে এবং সাবেক জনতা ব্যাংকের বারান্দায় তিনি প্রতিদিন বসেন। সকাল ১১টার দিকে তার সাথে আলাপ করলে জানালেন যে, একজন গ্রাহক এখন পর্যন্ত পেয়েছেন। তার জুতা পালিশ করে ৩০ টাকা হয়েছে। সারাদিনে হয়ত আরো কিছু আয় হবে। হয়ত ৫০-১০০ টাকা হবে। হলে ভাল। না হলেও করার কিছু নাই। করোনা পরিস্থিতির পর লোকজন আর আগের মত তাদের কাছে আসছে না। ফলে আয়- রোজগার ব্যাপক হারে কমে গেছে। গত কয়েকদিন ধরে কোনদিন ১০০ টাকা কোনদিন দেড়শ’ টাকা আয় করেছেন। এই আয়ে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাবুলাল রবিদাসের বয়স পঁচাত্তরেরও বেশি। মুচির কাজ করছেন ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। বললেন, সময়টা খুব খারাপ যাচ্ছে বাবু। কবে যে করোনা যাবে, আর কবে যে আমাদের আয় বাড়বে বুঝতে পারছিনা।

দিনাজপুর জেলা রবিদাস সমাজ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি দিলচান রবিদাস বললেন, আমাদের আয় ভীষণ ভাবে কমে গেছে। সরকার যদি আমাদের মতো দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য আরো ত্রাণের ব্যবস্থা করেন তাহলে খেয়ে পরে বাঁচতে পারব। এখন আমাদের অবস্থা কত খারাপ পর্যায়ে আছে বোঝাতে পারব না।

সংস্থার সাধারণ সম্পাদক অশোক রবিদাস বললেন, করোনাকালে আমরা অনেকের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। তখন মাননীয় হুইপ ইকবালুর রহিম, সদর উপজেলা প্রশাসন, জেলা আওয়ামী লীগ, জেলা সমাজসেবা অফিসসহ বিভিন্ন মহলের সহযোগিতা পেয়েছি। সকলের সহযোগিতায় আমরা সদস্যদের মাঝে চার বার ত্রাণ দিয়েছি। সমাজ সেবা অফিস আমাদের প্রত্যেক সদস্যকে ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দিয়েছেন। এইসব সহযোগিতা নিয়ে আমরা করোনাকালে ভালই ছিলাম। কিন্তু এখন আমাদেরকে কেউ ত্রাণ দিচ্ছে না, আবার আয় রোজগারও ঠিকমত হচ্ছে না। ফলে ভীষণ সমস্যার মধ্যে পড়েছি। আমাদের দিন ভাল যাচ্ছে না।

রবিদাস সমাজ উন্নয়ন সংস্থার জেলা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লিখন রবিদাস সরকারের অভিমত হলো, আয় না থাকলে ভাল থাকা যায় না। দিনাজপুরে রবিদাসসহ দলিত জনগোষ্ঠীর লোকেরা এখনো সমস্যার মধ্যে আছে। তারা কর্ম পাচ্ছে না তাই আয় হচ্ছে না। তার আবেদন মাননীয় হুইপ, প্রশাসন, সমাজ সেবা কর্তৃপক্ষ যেন তাদের জন্য ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রাখেন।

কবুতরী বাঁশফোর হলেন হরিজন জনগোষ্ঠীর মধ্যবয়সী এক মহিলা। লকডাউন ওঠার পর কাজ যোগাড়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই এখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাহায্য-সহায়তা তুলে জীবন ধারণের চেষ্টা করছেন। তিনি বললেন, আমরা হরিজন কমিউনিটির মানুষেরা লকডাউনের সময় ত্রাণসহ বিভিন্ন সহায়তা পেয়েছিলাম। এখন ত্রাণ সহায়তা নেই আবার আমাদের কাজও নেই। কেউই আমাদের ডাকছে না। ফলে আমাদের উপার্জন প্রায় বন্ধ। আমরা খুব খারাপ অবস্থায় আছি। এই মধ্যবয়সী নারীরও আবেদন হরিজনদের জন্য যেন আপদকালীন সহায়তা এ বছরের পুরো সময়টা যেন অব্যাহত রাখা হয়।

দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ও জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি স্বরুপ বকসী বাচ্চুর অভিমত, লকডাউন উঠলেও দরিদ্র মানুষের পরিস্থিতির উন্নয়ন হয় নাই। তাই দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রাখা দরকার।

আজহারুল আজাদ জুয়েল, সিনিয়র রিপোর্টার- আজকের দেশবার্তা এবং বাংলাদেশ দলিত মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম এর সভাপতি।

Facebook Comments