হবিগঞ্জে চর্চা ও সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে দলিত জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা

 Posted on

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সদরুল হোসেন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্রী চা-শ্রমিক কন্যা মলিনা মুন্ডার সাথে কথা বলছেন প্রতিবেদক মঈন উদ্দিন আহমেদ
হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সদরুল হোসেন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্রী চা-শ্রমিক কন্যা মলিনা মুন্ডার সাথে কথা বলছেন প্রতিবেদক মঈন উদ্দিন আহমেদ

মঈন উদ্দিন আহমেদ, হবিগঞ্জ :
হবিগঞ্জে চর্চা ও সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে দলিত জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা। মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় সংযুক্ত না করায় মাতৃভাষা চর্চা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে হবিগঞ্জের চা-বাগানসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকজন। তাই দলিত জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষায় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোর পাঠ্য বইয়ে আদিবাসী ভাষার অন্তর্ভুক্তি, ভাষা ও বর্ণমালা চর্চা এবং সংরক্ষণে স্কুল বা ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাতৃভাষা চর্চাকেন্দ্র এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানান আদিবাসী নেতৃবৃন্দ।

এ ব্যাপারে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সদরুল হোসেন বালিকা ঊচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্রী চা-শ্রমিক কন্যা মলিনা মুন্ডা বলেন, তাদের মাতৃভাষা মূূলত ফার্সি ভাষার সংকলন। এ ভাষা তারা বংশ পরম্পরায় পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে শিখে আসছেন। এ ভাষায় তাদের কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। স্কুলের পাঠ্য পুস্তকেও এ ভাষা সম্পৃক্ত নয়। বা তারা যে চা-বাগানে বাস করেন সেখানেও এ ভাষা শিক্ষার কোন স্কুল বা প্রতিষ্ঠান নেই। তাই তারা আস্তে আস্তে তাদের মাতৃভাষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। বিশেষ করে চা-বাগানের শ্রমিক পরিবারের যে সকল শিশু স্কুলে যাচ্ছে তারা দিন দিন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তারা তাদের অজ্ঞাতে নিজস্ব মাতৃভাষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আস্তে আস্তে তারা নিজেদের অজান্তেই নিজেদের মাতৃভাষা ভুলে যেতে বসেছে। এভাবে চলতে থাকলে এমন এক সময় আসবে যখন আদিবাসী পরিবারের শিশুরা তাদের মাতৃভাষা কী তা তারা নিজেরাই বলতে পারবে না। তিনি মনে করেন, মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় সংযুক্ত না করায় মাতৃভাষার চর্চা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হবিগঞ্জের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকজন।
তিনি বলেন, তাদের মাতৃভাষাচর্চা এখন অনেকটাই মৌখিক কথানির্ভর। হবিগঞ্জ জেলার বেশিরভাগ ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠীর শিশুরা তাদের নিজস্ব মাতৃভাষা পড়তে লিখতে পারে না। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়গুলোতেও নেই তাদের নিজস্ব ভাষাচর্চার বই কিংবা শিক্ষক। এতে ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে তাদের মাতৃভাষা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। দলিত জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা টিকিয়ে রাখতে তিনি অবিলম্বে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়গুলোতে তাদের নিজস্ব ভাষাচর্চার বই এবং শিক্ষক নিয়োগের দাবির পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার দীননাথ ইনস্টিটিউশন এর ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী, মধুপুর চা-বাগানের বড়গুল (সাতপাড়িা বস্তি) এর বাসিন্দা আপন মৃধা বলেন, তাদের বস্তিতে মধুপুর চা-বাগানে শ্রমিক হিসেবে যারা কাজ করেন তাদের মধ্যে রবিদাস, মুন্ডা, ভর, বড়াইক, বাউরী, মির্ধা, কংস পাঠ, ভৌমিজসহ নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছেন। এ বস্তিতে প্রায় ৪০টি পরিবারের বসবাস। যার লোক সংখ্যা প্রায় ৩শ’। স্কুলগামী শিশুর সংখ্যা প্রায় ২৫জন। তারা সাধারণত চা-বাগানের টিলার পাদদেশ, বন কিংবা সমতল ভূমিতে বসবাস করেন। তিনি স্কুলে লেখাপড়া করলেও নিজেদের মাতৃভাষার নাম বলতে পারেন না। এমনকি বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার ফলে সেখানে যে ভাষা চর্চা করেন পরিবারের সাথে কথা বলার সময় সে ভাষার প্রয়োগ করেন বেশি। তাই নিজস্ব ভাষায় সঠিকভাবে কথাও বলতে পারেন না তিনি। তিনি মনে করেন, বাগান এলাকায় আদিবাসী ভাষা শেখার কোন প্রতিষ্ঠান বা বিদ্যালয়ের পাঠ্য বইয়ে আদিবাসী ভাষা সম্পৃক্ত না করায় দিন দিন আদিবাসী সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব ভাষা হারিয়ে ফেলছে। বর্তমানে চা-শ্রমিক পরিবারের শিশুরা আগের চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষার আলোয় আলোকিত হচ্ছে। তবে তার পাশাপাশি তারা নিজেদের মাতৃভাষা হারিয়ে ফেলছে। এজন্য তিনি নিজেদের মাতৃভাষা চর্চার উপর গুরুত্ব দেন। তিনি আরও বলেন, হবিগঞ্জের বিভিন্ন চা-বাগান ও বাহুবলের খাসিয়া পুঞ্জিতে খাসি, গারো, মনিপুরি, ত্রিপুরা, মুন্ডা, ওরাঁওসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বসবাস। তাদের নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি থাকলেও বাংলা ভাষা শিখতে গিয়ে তারা তাদের মাতৃভাষা ভুলে যেতে বসেছে। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বিপাকে রয়েছে কোমলমতি শিশুরা। স্কুলে তারা বাংলা ভাষা রপ্ত করতেই ব্যস্ত থাকতে হয়, তাই নিজস্ব মাতৃভাষা চর্চা করার সময় তাদের থাকে না। যদিও আজকাল সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান দলিত জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষায় নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে আলিয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জিতে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে দলিতদের নিজস্ব মাতৃভাষা চর্চা করার সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু এ উদ্যোগ কতটা সফল হবে তা নির্ভর করে স্কুলের স্থায়ীত্বের উপর।

মধুপুর চা-বাগানের বড়গুল (সাতপাড়া বস্তি) এর বাসিন্দা শ্রমিক সর্দার সুদ্বীপ মির্ধা বলেন, চর্চা ও সংরক্ষণের অভাবেই দলিত জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা হারিয়ে যেতে বসেছে। দেশের সব নাগরিকের নিজ নিজ মাতৃভাষা ব্যবহারের অধিকার রয়েছে এবং রাষ্ট্রেরও কর্তব্য দলিত জনগোষ্ঠীর ভাষা ও বর্ণমালাচর্চার সুব্যবস্থা করা এবং তাদের নিজস্ব ভাষা সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া।

একই বস্তির মতিলাল ভৌমিজ বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ না থাকায় আমাদের নিজস্ব ভাষা দিন দিন আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। আমরা আমাদের মাতৃভাষা কী তা সঠিকভাবে বলতে পারি না। আমাদের পূর্ব পুরুষ থেকে নিজেদের মধ্যে চর্চার মাধ্যমে আমাদের মাতৃভাষা টিকে আছে। প্রাথমিক পর্যায় থেকেই দলিত জনগোষ্ঠীর শিশুদের বাংলা ভাষায় পড়ানো হচ্ছে। ফলে শিশুকাল থেকেই তারা বাংলা ভাষা রপ্ত করছে। এ কারণে আমাদের অনেকেই নিজেদের ভাষায় কথা বলতে পারলেও লিখতে পারে না। দলিত জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষায় তিনি সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এ ব্যাপারে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ রুহুল্লøাহ বলেন, “একটি ভাষাকে আমরা কখনো হারিয়ে যেতে দিতে পারি না। এ ব্যাপারে আমরা আন্তরিক। ক্ষুদ্র নৃতাত্তি¡ক জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা আমাদের ধরে রাখতে হবে।”

মঈন উদ্দিন আহমেদ, বার্তা সম্পাদক, দৈনিক হবিগঞ্জের মুখ, সহ-সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জ জেলা শাখা, কোষাধ্যক্ষ, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন হবিগঞ্জ জেলা শাখা, সদস্য, বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম।

 

Facebook Comments