চাকমা

 Posted on

বাংলাদেশের বৃহত্তম আদিবাসী জনগোষ্ঠী। পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলেই তাদের প্রধান বসতি। এখানে তারা আরও কয়েকটি আলাদা আদিবাসী সঙ্গে মিশ্রিত। চাকমাদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে কোনো সঠিক উপাত্ত পাওয়া যায় না। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হিসেব অনুযায়ী তাদের সংখ্যা ১৯৫৬-তে ১,৪০,০০০ ও ১৯৮১-তে ২,৩০,০০০ ছিল বলে জানা যায়। ১৯৯১-এর  আদমশুমারি অনুযায়ী, চাকমা জনসংখ্যা প্রায় ২,৫৩,০০০। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল অর্থাৎ রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা চাকমা জাতির মূল আবাস ভূমি। তবে কক্সবাজার জেলার টেকনাফেও তারা বাস করে। এছাড়া ভারতের ত্রিপুরা, মিকিরহিল, মিজোরাম ও অরুণাচল রাজ্যেও তাদের বাস রয়েছে।ছোট ছোট দলে বেশকিছু চাকমা অন্যান্য দেশেও বসতি স্থাপন করেছে।

চাকমা অলঙ্কার পরিহিত রমণী

ঐতিহ্যগতভাবে চাকমা জীবনধারা জুম চাষের সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘জুম’ চাষ পদ্ধতির মাধ্যমে গোটা বছর তারা ফসল উৎপাদন করেন।  চাকমাদের জুমে ধান ছাড়া তিল, কুমড়া, মিষ্টি কুমড়া, বেগুন ইত্যাদি কার্যকরী ফসল ছাড়াও নানা ফলমূল, শাকসবজি, আদা, হলুদ ইত্যাদি অর্থকরী ফসলের চাষ করা হয়। ধীরে ধীরে এই কৃষিভিত্তিক সমাজের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে চাকমাদেরকে আরও বেশি করে কৃষি-বহির্ভূত কাজ খুঁজে নিতে হয়। এ সমস্যা সরকারের জনসমষ্টি স্থানান্তরের নীতির কারণে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিক থেকে নিম্নভূমিতে আবাদে অভ্যস্ত হাজার হাজার গরিব বাঙালিকে সামরিক নিরাপত্তায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আনা হয়। এতে জমির অভাব আরও তীব্রভাবে বেড়ে যাওয়ায়  চাকমা ও অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এ ঘটনাটিকে তাদের জীবনধারার জন্য আরও বিপজ্জনক বলে গণ্য করে। এদের অনেকে সস্তাদরের মজুরে পর্যবসিত হতে বাধ্য হয়, অনেকে নতুন রাবার বাগানগুলিতে শ্রমিকের কাজ খুঁজে নেয়। প্রায় ৫০,০০০ চাকমা দেশ থেকে পালিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আশ্রয় নেয় ও সেখানে ১৯৮৬ সাল থেকে তাদেরকে শরণার্থী জীবন বেছে নিতে হয়। তাদের এ অবস্থা চলতে থাকে ১৯৯৮ সালে দেশে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত।

আদিবাসী সমাজ ব্যক্তি মালিকানায় বিশ্বাসী নন। চাকমা সমাজ প্রাচীন কাল থেকে ভূমির মালিকানা বিষয়ে সমষ্টিক মালিকানায় বিশ্বাসী। সেই কারণে ভূমির মালিকানার প্রমাণ হিসেবে দলিল-দস্তাবেজের প্রচলন চাকমাদের মধ্যে নাই। যুগ যুগ ধরে চাকমারা পাবর্ত্যঞ্চলে বসবাস ও ভূমি আবাদ করে আসছেন বলে চাকমারা এই ভূমিকে তাদের পূর্বপুরুষের ভূমি বলেই জানে ।  চাকমাদের সমাজব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক। চাকমা সমাজে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী বিবেচিত হন পুত্রসন্তান। কন্যাসন্তান কেবলমাত্র বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত বাবা-মার পরিবারে ভরণপোষন পাওয়ার অধিকার ভোগ করেন। পিতার মৃত্যুর পর ছেলেরা পিতা ও মাতার সম্পত্তির অধিকার পান। তবে বিধবা নারী স্বামীর সম্পত্তির কোন ভাগ পায় না এবং মৃত স্ত্রীর সম্পত্তিও স্বামী দাবী করতে পারেনা।

কাপড় বুননরত চাকমা রমণী

চাকমাদের নিজস্ব পোশাক-পরিচ্ছদ রয়েছে। চাকমা নারীরা তাঁত শিল্পে দক্ষ, তাঁতে তারা নিজেদের পোশাক তৈরি করেন। বর্তমানে বানিজ্যিকভাবেও এ সকল পোশাকের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে চাকমারা বেশ অগ্রসর।চাকমা ভাষার নিজস্ব লিপি থাকলেও এ লিপির ব্যবহার সীমিত হয়ে পড়ছে।পার্বত্য অঞ্চলে কর্মসংস্থানের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও ভূমি দখল ইত্যাদি কারণে শত শত চাকমা পরিবার কাজের সন্ধানে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বিভিন্ন শহরাঞ্চলে গমন করছে। শহরকেন্দ্রিকতার ফলে তাদের সংস্কৃতি, ভাষা, রীতিনীতি ও সমাজব্যবস্থা হুমকির সম্মুখিন অর্থাৎ কিছুটা হারিয়ে যেতে বসেছে।

চাকমা বর্ণমালা

চাকমাদের একটা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। তারাই বাংলাদেশের বৃহত্তম বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী। তাদের বৌদ্ধ ধর্মরীতি ও আচারের সঙ্গে আরও প্রাচীন কিছু ধর্মীয় উপাদান যেমন, প্রাকৃতিক শক্তিপূজার মতো বিষয়ের যৌথ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। চাকমাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবগুলো হলো- কঠিন চীবর দান, বৈশাখী পূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমা, মধু পূর্ণিমা, মহাসংঘ দান ইত্যাদি।বর্তমানে চাকমাদের মধ্যে খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ লক্ষণীয় ভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন সামাজিক উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে চাকমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রের প্রকাশ ঘটেছে। চাকমাদের অন্যতম প্রধান বার্ষিক পর্ব হলো বিজু উৎসব। এ উৎসব বাংলা সনের শেষ মাস চৈত্রে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

তথ্যসূত্র : Willem van Schendel (ed.), Francis Buchanan in South-east Bengal (1798); His Journey to Chittagong, Chittagong Hill Tracts, Noakhali and Comilla; মেসবাহ কামাল, জাহিদুল ইসলাম ও সুগত চাকমা সম্পাদিত আদিবাসী জনগোষ্ঠী: বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমিক্ষামালা-৫, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০৭, পৃষ্ঠা: ৬৩-৬৬; বাংলাপিডিয়া ।

Facebook Comments