বীরাঙ্গণা শুভারানী ও তারাবালা’র দুঃখ কথা

 Posted on


॥ আজহারুল আজাদ জুয়েল ॥

নাম শুভারানী রায়। কিন্তু জীবনের পরতে পরতে দুঃখ, বেদনা, বঞ্চনার কাহিনী। নামের মধ্যে শুভা থাকলেও জীবনের কোথাও কোন দিন শুভ কিছু দেখতে পাননি। নামের মধ্যে রানী থাকলেও বাস্তবে সারা জীবন পরের অনুগ্রহে জীবন কেটেছে। কেন বাবা-মা আমার নাম শুভারানী রেখেছিলেন আজও বুঝে উঠতে পারেন নাই শুভারানী। তিনি বলেন, হয়তো রানীর মত দেখতে হইছিলাম, হয়তো বাবা-মায় আমার মধ্যে শুভ কিছু পাইতে চাইছিল, কিন্তু তারাও কিছু পায় নাই, আমিও না।
শুভারানী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালের একজন বীরাঙ্গণা। থাকেন দিনাজপুরর বীরগঞ্জ উপজেলার পাল্টাপুর আশ্রায়ন প্রকল্পের একটি ঘরে। সরকারি উদ্যোগে ছিন্নমুল মানুষের জন্য এই আশ্রয়ন প্রকল্প গড়ে উঠেছে ঢেপা নদীর উত্তর তীরে। এখানে তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন ভূমিহীন মানুষ হিসেবে। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধে যা হারিয়েছেন তার প্রেক্ষিতে সরকারি-বেসরকারি কোন কিছু জীবনের কোন সময়ই পাননি।
শুভারানী এখন থাকেন ঢেপা নদীর উত্তরে পাল্টাপুর ইউনিয়নের আশ্রায়ন প্রকল্পে। মুক্তিযুদ্ধের সময় থাকতেন ঐ নদীর উল্টো দিকে, অর্থাৎ দক্ষিণের কুড়িটাকিয়া বাজার সংলগ্ন এলাকায়। এই বাজারটির অবস্থানও পাল্টাপুর ইউনিয়নে। একাত্তরে ছিলেন ১৫ বছরের কিশোরী এবং অবিবাহিত। তার পিতা রশিনাথ রায় পেশায় ছিলেন বাঁশমালি। বাঁশের তৈরী দ্রব্যাদি তৈরী ও বিক্রি করে সংসার চালাতেন। তার মাতা কুলোবালা রায় একই কাজে স্বামীকে সাহায্য করতেন। বাঁশের কাজ হলো তাদের বংশ পরম্পরার পেশা।
একাত্তরের মার্চ মাসে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর পাকিস্তানি সেনারা এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় দিনাজপুর জেলার সর্বত্র তাদের আধিপত্য বিস্তার করে। তারা দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও সড়কের ভাতগাঁ ব্রিজের নীচে ঢেপা নদীর দক্ষিণ প্রান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বাংকার ও ট্রেঞ্চ খনন করে অবস্থান নেয়। ব্রিজ পাহাড়া দেয়ার পাশাপাশি যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে বীরগঞ্জের পাল্টাপুর ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে বাঙালি বিরোধী অভিযান চালায় এবং ঘর-বাড়িতে অগ্নি সংযোগ, লুন্ঠন, হত্যা, গণহত্যা ও নারী নির্যাতন চালায়।
শুভারানীর বাবা দরিদ্র রশিনাথ পরিবার নিয়ে কুড়িটাকিয়ায় থাকতেন। পরিবার বলতে স্ত্রী কুলোবালা এবং মেয়ে শুভারানী। হঠাৎ হঠাৎ পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে এদিক-ওদিক পালিয়ে যেতে হলেও বিপদ কেটে গেলে আবার নিজ বাড়িতে ফিরে আসতেন। এভাবে ভালই চলছিলেন বড় ধরনের কোন বিপদ ছাড়া। অক্টোবরের যুদ্ধের শেষের দিকের এক মধ্য রাতে হঠাৎ করে বাড়িতে এসে হাজির হয় পাকিস্তানি নরখাদক খান সেনারা। তারা ধরে নিয়ে যায় শুভারানীকে। তাদেরকে বাধা দিতে গিয়ে বেদম নির্যাতনের শিকার হন তার বাবা ও মা।


শুভা জানান, সেদিন রাত প্রায় ১১টার দিকে ৪-৫ জন খান সেনা তাদের বাড়িতে আসে। তারা তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যেতে চাইলে বাবা বাধা দেয়। তখন খান সেনারা রাইফেলের আগালে থাকা ধারালো চাকু (বেয়নেট) দ্বারা বাবাকে হুল মারে। হুলের আঘাতে ধারালো চাকু হাতের একদিক দিয়ে ঢুকে গিয়ে আরেক দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। এ সময় মা বাধা দেয়ার চেস্টা করলে তার মাথাতেও রাইফেল দিয়ে আঘাত করে। মায়ের মাথা ফেটে যায়। এরপর মা-বাবাকে হাটখোলায় ধরে নিয়ে যায় এবং শুভারানীকে ভাতগাঁ ব্রিজের নীচে একটি খোলা জায়গায় ধরে নিয়ে আসে। সেখানে আরো একজন মহিলাকে আগেই ধরে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং কয়েকজন তার সাথে খারাপ ব্যবহার করছিল। খান সেনারা শুভারানীর সাথেও রাতভর খারাপ ব্যবহার করলে তিনি ভিষণ অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। ভোর বেলা খান সেনাদের একজন মেজর সেখানে এসে তাকে দেখতে পায় এবং নির্যাতক খান সেনাদের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে মুমুর্ষ অবস্থায় বাড়ি পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করে। এরপর এলাকার বিশু ডাক্তার তার নিজ বাড়িতে তাকে ও তার বাবা-মাকে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করেন। সেখানে দেড়-দুই সপ্তাহ থাকার পর রঘুনাথপুরে পালিয়ে যান। রঘুনাথপুরে মাসখানেক থাকার পর দেশ স্বাধীন হয়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার বছর খানেক পর শুভারানীর বিয়ে হয়। কিন্তু বছর পাঁচেক আগে স্বামী মারা গেছেন। তাদের এক মেয়ে, এক ছেলে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছেলে দিনমজুরী করে দিন পার করছে। আর শুভারানী নিজে বাঁশমালির কাজ করেন। বাঁশের ডালি, কুলা, ডন তৈরী ও বিক্রি করেন। থাকেন আশ্রায়ন প্রকল্পের ঘরে। তার দুঃখ স্বাধীনতার জন্য তার যে ক্ষতি হয়েছে এর বিপরীতে নিজের জন্য কিংবা ছেলে-মেয়েদের জন্য সরকারের তরফ থেকে জীবনে কিছুই পেলেন না।
পার্বতীপুর উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নের খিয়ারপাড়ায় থাকেন মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত আরেক নারী তারাবালা রায় (৬২)। আজ তিনিও নিদারুন অর্থ কষ্টে জর্জরিত হয়ে দিনাতিপাত করছেন। খিয়ারপাড়ার শরৎ চন্দ্র রায় (৪২) ও হরেশ^র চন্দ্র রায় (২১) ছিলেন শ^শুর ও জামাই। মে মাসের দিকে একদিন পাকিস্তানি সেনা ও বিহারিরা অকস্মাৎ ঐ পাড়ায় হামলা চালায়। তারা ঐ পাড়ার বহু বাড়ি-ঘর থেকে গরু, ছাগল সহ মূল্যবান মালামাল লুট করে। ঐ পাড়ার শরৎ চন্দ্র রায় তার স্ত্রী ফুলমনি রায়, তার জামাই হরেশ^র চন্দ্র রায় ও মেয়ে তারাবালা রায়কে এক সাথে ধরে নিয়ে যায়। এছাড়া সমো নামের আরেকজন কিশোরী মেয়েকেও ধরে নিয়ে যায় বিহারিরা। তারাবালা ছিলেন নব বিবাহিতা। সমো অবিবাহিতা। তাদেরকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর খবর পাওয়া যায়নি তিন দিনেও। তিন দিন পর ফুলমনি, তারাবালা ও সমোকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তারা বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। ঐ তিন দিনে যা হওয়ার তাই হয়েছিল। মা- মেয়ের সর্বস্ব লুট করে নিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার ও বিহারিরা। অপর দিকে তারাবালার শ^শুর শরৎ ও জামাই হরেশ^রকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের আর কোন খবর পাওয়া যায় নাই। আজ পর্যন্ত তারা ফিরেও আসে নাই। তাদেরকে কোথায় হত্যা করা হয়েছে তা কেউ জানে না।
নির্যাতিতা ফুলমনি মারা গেছেন। তার মেয়ে তারাবালা বীরাঙ্গণা হিসেবে স্বীকৃতি পাবার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছেন। তবে এর কোন ফলাফল এখন পর্যন্ত পান নাই একাত্তরের এই নির্যাতিতা। সমো এখনো অর্থনৈতিক কষ্টে জর্জরিত আছেন। কিন্তু তাদের খবর কেউ রাখেনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের বীরাঙ্গণা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই স্বীকৃতির বিপরীতে তাদের দু:খ, কষ্ট, বেদনা ও দূর্দশা মোচনের উদ্যোগ নেই। ফলে নির্যাতিতা নারীরা অসহায়ত্বের মধ্যে দিন যাপন করছেন। এর ফলে ফ্যাকাসে হয়ে পড়ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ।

Facebook Comments